How Rohingyas are Getting Citizenship of Bangladesh?

70

মিয়ানমার সৃষ্ট চলমান রোহিঙ্গা সংকট যতই দিন যাচ্ছে, ততই বাংলাদেশের জন্য একটার পর একটা সমস্যা সৃষ্টি করে চলেছে। ক্যাম্পের ভেতর অপরাধ কার্যক্রম, মানব পাচার, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান, হত্যা ও অন্যান্য নানা ধরনের অপরাধ সংঘটিত করে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে সামাজিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত হুমকি সৃষ্টি করছে। এর সঙ্গে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের নাগরিকত্ব নেওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। তারা এদেশীয় একশ্রেণির দেশের স্বার্থবিরোধী, অসাধু মানুষের যোগসাজশে ভোটার তালিকায় যুক্ত হচ্ছে। তারা বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশেও চলে যাচ্ছে, যা আশঙ্কাজনক। কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোর নিবন্ধিত রোহিঙ্গারা বিভিন্ন উপায়ে বাংলাদেশের ভোটার হচ্ছে এবং জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) পেয়ে যাচ্ছে। রোহিঙ্গারা যাতে ভোটার হতে না পারে, সেজন্য নির্বাচন কমিশনের (ইসি) পক্ষ থেকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে বলা হলেও তা উপেক্ষা করা হচ্ছে এবং এ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ইসিও এখন উদ্বিগ্ন। রোহিঙ্গারা চট্টগ্রাম অঞ্চল ছাড়াও দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এ পরিচয়পত্র সংগ্রহ করছে।

মিয়ানমারে অত্যাচারের শিকার এ রোহিঙ্গারা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে অবস্থান করছে এবং নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার বিষয়ে তারা কোনো আশার আলো দেখছে না বিধায় অনেকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব নিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে মিশে যাওয়ার চেষ্টা করছে। অনেকে বিদেশে যাওয়ার জন্য সুযোগ পেলেই বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশ চলে যাচ্ছে। এ প্রক্রিয়া বন্ধ করতে হলে স্থানীয় জনগণ এবং সমাজের সর্বস্তরে দেশপ্রেম ও সচেতনতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।

রোহিঙ্গাদের কারা, কেন, কীভাবে এনআইডি সরবরাহ করছে, তা খুঁজে বের করতে তদন্ত শুরু করেছে ইসি। রোহিঙ্গাদের ভোটার হতে কেউ না কেউ সহযোগিতা করছে। কারণ এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে তারা অনলাইনে জন্মসনদ এবং চেয়ারম্যান-কাউন্সিলর থেকে নাগরিক সনদ পাচ্ছে। এ বিষয়েও তদন্ত করা জরুরি। প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং কিছু প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধির যোগসাজশে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে রোহিঙ্গারা ভোটার হচ্ছে। সিন্ডিকেটটি রোহিঙ্গাদের জন্য ভোটার হতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরির ব্যবস্থা করে। ইসির পক্ষ থেকে চট্টগ্রামের বিশেষ ৩২ এলাকা ছাড়াও সারা দেশে রোহিঙ্গাদের ভোটার না করার ব্যাপারে কঠোর নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়। রোহিঙ্গারা নির্দেশনার বাইরের এলাকা থেকে বাংলাদেশি পরিচয়ে এখন ভোটার হচ্ছে। ফলে তাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। রোহিঙ্গাদের ভোটার করতে এক থেকে দেড় লাখ টাকার লেনদেন হচ্ছে বলে জানা যায়। এ কাজে জড়িতরা রোহিঙ্গাদের এই অবৈধ সুযোগ দিয়ে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে, যা উদ্বেগজনক।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসব ঘটনায় জড়িত অপরাধী ব্যক্তিদের গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় নিয়ে আসছে। ইসি ভোটার তালিকা প্রথমবার হালনাগাদ করার সময় সীমান্তবর্তী বিভিন্ন উপজেলার ৫০ হাজার রোহিঙ্গা ভোটার শনাক্ত হয়। উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণের পর ৪২ হাজার রোহিঙ্গা ভোটারের নিবন্ধন বাতিল করা হয়। রোহিঙ্গারা যাতে ভোটার হতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্কতা জারি করার পাশাপাশি রোহিঙ্গা শনাক্ত করতে এখন দুটি ডেটাবেজ ব্যবহার করা হচ্ছে। যারাই নতুন ভোটার হচ্ছে, তারা রোহিঙ্গা কিনা তা শনাক্ত করতে ১১ লাখ ২২ হাজার নিবন্ধিত রোহিঙ্গার ডেটা চেক করে সেখানে রোহিঙ্গা হিসাবে নো ম্যাচিং আসার পর ইসির ডেটাবেজ চেক করে নো ম্যাচিং এলে তবেই নতুন ভোটার হিসাবে কেন্দ্রীয় সার্ভারে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।

২০২৩ সালের ২৭ আগস্ট রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের নাগরিক হিসাবে জন্মনিবন্ধন, ভোটার আইডি ও পাসপোর্ট করতে সহযোগিতা করায় একটি মামলার চার্জশিট অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বাংলাদেশ সরকার জন্মসদন, এনআইডি ও পাসপোর্ট করতে রোহিঙ্গাদের যারা সহায়তা করছে, তাদের আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দিয়েছে। ইতোমধ্যে এগুলো সংগ্রহ করেছে অনেক রোহিঙ্গা, যা বাতিল করারও নির্দেশ দিয়েছে সরকার। রোহিঙ্গারা যেভাবে এদেশের নাগরিক হয়ে যাচ্ছে, তাতে স্থানীয়রা আতঙ্কিত। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট তৈরিতে সহায়তা করছে স্থানীয় কিছু মানুষ এবং রোহিঙ্গা দালালদের সিন্ডিকেট। এরা অর্থের বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সরবরাহ করে। ওই সিন্ডিকেটের শক্তিশালী এবং ক্ষমতাবান নেটওয়ার্ক থাকায় পুলিশি যাচাই-বাছাইকরণসহ অন্যান্য প্রক্রিয়ায় এসব অনিয়ম শনাক্ত করা কঠিন।

এদিকে ’৭৫-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের একটি অংশকে নিতে রাজি হয়েছিল সৌদি সরকার। বেশকিছু রোহিঙ্গা তখন বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে সৌদি আরব যায়। বাংলাদেশের পাসপোর্টে সৌদি আরবে থাকা ৬৯ হাজার রোহিঙ্গার একটি তালিকা তৈরি করেছে দেশটি। তাদের পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় সৌদি সরকার বাংলাদেশকে রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট নবায়ন করার জন্য জানায়। বাংলাদেশ সরকার সৌদি আরবে থাকা ওই ৬৯ হাজার রোহিঙ্গার পাসপোর্ট নবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সারা দেশে কত রোহিঙ্গাকে ভোটার করা হয়েছে, তদন্ত করে তার তালিকা দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। ৮ আগস্টের মধ্যে এ তালিকা দাখিলের জন্য নির্বাচন কমিশন, স্থানীয় সরকার সচিব, কক্সবাজারের ডিসিসহ সংশ্লিষ্টদের এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান প্রক্রিয়ার সঙ্গে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের কয়েকজন জনপ্রতিনিধির সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।

রোহিঙ্গাদের নিবন্ধন নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিয়মিত মনিটরিং ও হালনাগাদ করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের আগপর্যন্ত এটি চালিয়ে যেতে হবে। রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে রোহিঙ্গারা মিশে গেলে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দেবে এবং তা কখনো কাম্য নয়। স্থানীয় কর্মকর্তাদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতে, রোহিঙ্গাদের নিবন্ধন ও সংখ্যা হালনাগাদ রাখা তাদের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার সুবিধার্থে প্রশাসন বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে রোহিঙ্গাদের পরিচয় নিশ্চিত করে। এ চলমান প্রক্রিয়া রোহিঙ্গাদের অধিকার নিশ্চিত করার প্রথম পদক্ষেপ এবং এ রেজিস্ট্রেশন কার্ডের মাধ্যমে তাদের থাকা-খাওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোয় প্রতিদিন গড়ে ১০০ শিশু জন্মগ্রহণ করছে। ইউএনএইচসিআরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে ২ লাখের বেশি পরিবারের ৯ লাখ ৭৯ হাজার ৩০৬ জন রোহিঙ্গা কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোতে বসবাস করছে। মাঠকর্মীরা নিয়মিত বাড়িতে গিয়ে রেকর্ড হালনাগাদ রাখে এবং রোহিঙ্গা পরিবারগুলোও প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের পরিবারের সদস্য নিবন্ধন হালনাগাদ করে। বিশাল এ জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দিতে ধারাবাহিক নিবন্ধন এবং তা হালনাগাদ করা অপরিহার্য।

রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ববিষয়ক অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ করতে প্রশাসনের সর্বস্তরে এ বিষয়ে সচেতনতা ও জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকলে বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে থাকবে। রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা এবং তাদের পাসপোর্ট তৈরিতে সহায়তাকারী সিন্ডিকেট চিহ্নিত করে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। হাইকোর্টের এ উদ্যোগে অনিয়মের সঙ্গে জড়িতরা সতর্ক হবে। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি জনগণের সঙ্গে মিশে যাওয়ার ঝুঁকি এড়াতে একটা ডেটাবেজের মাধ্যমে হালনাগাদ নিশ্চিত করতে হবে। অনেক স্থানীয় ব্যক্তি রোহিঙ্গাদের চোরাচালানের কাজে ব্যবহার করছে। এ কাজে যারা জড়িত তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। বাংলাদেশ সরকার তাদের আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নিচ্ছে। অনেক রোহিঙ্গা দেশের ক্যাম্পগুলোয় বিলাসী জীবনযাপন করছে। তারা মিয়ানমারে ফিরে যেতে চাইবে না। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার জন্য প্রেষণা চলমান রাখতে হবে। জাতিসংঘ, সাহায্য সংস্থা ও এনজিওগুলোকে এ ব্যাপারে উদ্যোগী হতে হবে।

বাংলাদেশ একটা জনবহুল দেশ। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মানবিক বিবেচনায় বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষে অনির্দিষ্টকাল এ সংকট টেনে নেওয়া সম্ভব নয়। রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে ও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু না হওয়ায় সৃষ্ট সমস্যা যেন বাংলাদেশের জন্য বোঝা না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। রোহিঙ্গারা যাতে বাংলাদেশে জনস্রোতে মিশে যেতে না পারে, সে বিষয়ে বাংলাদেশের নাগরিক, জনপ্রতিনিধি, বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে সচেতন দেশপ্রেমিকের দায়িত্ব পালন করতে হবে। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনই এ সংকটের একমাত্র সমাধান বিধায় এ কাজে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিকতার সঙ্গে দ্রুত প্রত্যাবাসনের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

– ব্রিঃ জেঃ হাসান মোঃ শামসুদ্দীন (অবঃ), এনডিসি, এএফডব্লিউসি, পিএসসি, এম ফিল, মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা বিষয়ক গবেষক (সিবিজিএ)।

যুগান্তরে প্রকাশিত [লিংক]