Global Support for the Palestine State

146

সম্প্রতি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে একটি অসাধারণ ঘটনা ঘটেছে। ফিলিস্তিনকে জাতিসংঘের সদস্য হিসেবে স্বীকৃতির পক্ষে নজিরবিহীন আন্তর্জাতিক সমর্থন লক্ষ করা গেছে। আমরা জানি ২০১২ সাল থেকে ফিলিস্তিনকে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক হিসেবে মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্যপদ প্রাপ্তির জন্য একাধিকবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব উত্থাপিত হয়।

যথারীতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভেটোর কারণে তা গ্রহণ করা যায়নি। কিন্তু ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মর্যাদার আসনে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২০১২ সাল থেকে প্রতিষ্ঠা করেছে। এবার ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায় সূচিত হয়েছে যা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত ইতিবাচক ঘটনা। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ২০২৪ সালের ১০ মে যে ভোটাভুটি হয়েছে সেখানে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে জাতিসংঘের সদস্য করার পক্ষে ১৪৩টি দেশ রায় দিয়েছে। অন্যদিকে ৯টি রাষ্ট্র এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে। স্বাভাবিকভাবে এ ৯টি রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখে। এ রাষ্ট্রগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের পদাঙ্ক অনুসরণ করে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের অস্তিত্বের বিরোধিতা করেছে। ২৫টি রাষ্ট্র এ ভোটাভুটি থেকে বিরত ছিল অর্থাৎ তারা একটি নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখে। ফলে দেখা যাচ্ছে ১৪৩টি রাষ্ট্রের সঙ্গে যদি আরও ২৫টি রাষ্ট্র যুক্ত করা হয় তা হলে সে সংখ্যা দাঁড়াবে ১৬৮টি।

জাতিসংঘের সদস্য রয়েছে ১৯৩টি রাষ্ট্র। সেখানে ১৬৮ সদস্য রাষ্ট্র প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে সমর্থন করছে। শুধু সমর্থনই নয়, তারা ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে জাতিসংঘের সদস্য হিসেবে এখনই দেখতে চায়। যে রাষ্ট্রগুলো সরাসরি দেখতে চায় সে সংখ্যা ১৪৩। এ সংখ্যাটি ফিলিস্তিনিরা বা আরব বিশ্ব কিংবা মুসলিম দেশগুলোও কল্পনা করেনি। বিপুলসংখ্যক রাষ্ট্র ফিলিস্তিনের পক্ষে দাঁড়াবে এবং জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেবে তা অচিন্তনীয়। এটি নিঃসন্দেহে বর্তমানে গাজাতে যে গণহত্যা সংঘটিত হচ্ছে, যেখানে অসংখ্য নারী-শিশুকে হত্যা করা হচ্ছে তার বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদ। গাজার রাফা শহর যেখানে ১০ লাখ মানুষ সামান্য একটি জায়গায় অবস্থান করছে সেখানে আক্রমণ করে লাখ লাখ মানুষকে হত্যার পরিকল্পনা ইসরাইল করেছে। এ পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সদস্য করার পক্ষে যে বিপুল সমর্থন দেখা গেছে তা অত্যন্ত ইতিবাচক এবং জাতিসংঘের ও বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি এক ধরনের আশাবাদ তৈরি করে।

এ ভোটাভুটিতে যে ৯টি রাষ্ট্র সরাসরি প্রস্তাবের বিরোধিতা করে সে রাষ্ট্রগুলোর নাম দেখা যেতে পারে। প্রথমেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের নাম উল্লেখ করা যায় এবং তারপরে আর্জেন্টিনা, চেক প্রজাতন্ত্র, হাঙ্গেরিসহ কয়েকটি দ্বীপরাষ্ট্র যেমন নাওরো, মাইক্রোনেশিয়া, পাপুয়া নিউগিনি এবং পালাও। এ চারটি দ্বীপরাষ্ট্রসহ মোট ৯টি রাষ্ট্র এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে।

অন্যদিকে এ প্রস্তাবের পক্ষে সরাসরি সমর্থন না করলেও যে রাষ্ট্রগুলো ভোটদানে বিরত ছিল তা থাকার অর্থ অনেকটা এ প্রস্তাবকে সমর্থন করা বা ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের অস্তিত্বের ব্যাপারে তাদের একটি নিরপেক্ষ অবস্থান। ভোটদানে বিরত রাষ্ট্রগুলো হচ্ছে-আলবেনিয়া, অস্ট্রিয়া, বুলগেরিয়া, কানাডা, জার্মানি, ফিনল্যান্ড, লাটভিয়া, লিথুনিয়া, মালাউই, প্যারাগুয়ে, রোমানিয়া, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য ও ইউক্রেনসহ মোট ২৫টি সদস্য রাষ্ট্র। কিন্তু যে দেশগুলো ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে জাতিসংঘের সদস্যপদ প্রাপ্তির পক্ষে ভোট দিয়েছে সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মিত্র দেশ ভোট প্রদান করেছে। ইউরোপের ক্ষেত্রে যদি আমরা বিবেচনা করি তা হলে এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে-ফ্রান্স, আইসল্যান্ড, বেলজিয়াম, স্পেন, আয়ারল্যান্ডের নাম। তা ছাড়া জাপানও এ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হওয়া সত্ত্বেও অনেক দেশ ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পক্ষে ভোট দিয়েছে। ফিলিস্তিনের বর্তমান এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে এ সমর্থন নিঃসন্দেহে একটি বড় সান্ত্বনা। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটেও এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা যেতে পারে যে দেশগুলো সরাসরি বিরোধিতা করেছে যেমন যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যও ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের পক্ষে। কিন্তু তাদের বক্তব্য হচ্ছে ইসরাইলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। এটি আসলে অবাস্তব ধারণা।

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সদস্য রাষ্ট্রের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র এখন থেকে কতগুলো বিশেষ সুবিধা পাবে। ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের একটি নতুন মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এ প্রস্তাব পাস হওয়ার পর আমরা লক্ষ্য করেছি ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত এবং আরও অন্যান্য দেশের রাষ্ট্রদূতরা জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ধন্যবাদ দিয়েছে এবং পাশাপাশি সত্যের পক্ষে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থনের প্রশংসা করেছে। ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা ও অধিকারের পক্ষে এ বিপুল সমর্থন যা প্রকারান্তরে ইসরাইলের দখলদারিত্ব এবং আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একটি বড় ধরনের আন্তর্জাতিক রায়। সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত বলেছেন, সত্যকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রদূত বলেছেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যে ইচ্ছা তার একটি প্রতিফলন ঘটেছে এ ভোটের মাধ্যমে। এমনকি যুক্তরাজ্যও একটি দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে তাদের অবস্থান ব্যক্ত করেছে। ফ্রান্স পরিষ্কার করে বলেছে যে, এখনই একটি রাজনৈতিক সমাধানের প্রয়োজন। মূলত এ রায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশসহ ১৪৩টি রাষ্ট্র ফিলিস্তিনকে একটি নতুন মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছে যেটি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

এ নতুন মর্যাদা লাভ করার ফলে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে কি কি সুবিধা পাবে তার একটি ধারণা দেওয়া যেতে পারে। যেমন এখন থেকেই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর আসনে বর্ণনাক্রমিকভাবে ফিলিস্তিনের প্রতিনিধিরা বসতে পারবে। তারা একটি গ্রুপ বা গোষ্ঠীর পক্ষে বিবৃতি প্রদান করতে পারবে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বিভিন্ন ধরনের প্রস্তাব বা সংশোধনীর জন্য বিবৃতি উপস্থাপন করতে পারবে। জাতিসংঘে সাধারণ কিংবা বিশেষ যে অধিবেশন হবে সে অধিবেশনগুলোতে বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য অনুরোধ করতে পারবে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রতিনিধি সদস্যের অধিকার এবং বিভিন্ন অধিবেশনে নির্বাচিত হওয়ার অধিকার ভোগ করবে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধীনে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলন, সভাতে ফিলিস্তিন সম্পূর্ণ কার্যকরভাবে অংশগ্রহণ করতে পারবে। অনেকটা পূর্ণ সদস্যের মতোই জাতিসংঘে ফিলিস্তিনের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের উপস্থিতি ব্যাপক হয়েছে এবং ভূমিকা আরও বৃদ্ধি পাবে। তবে ভোটের অধিকার প্রয়োগ করতে পারবে না।

কিন্তু অন্য সব কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে পারবে। সেদিক থেকে ফিলিস্তিনিদের জন্য এটি একটি বিশাল বিজয়। যে দেশগুলো ফিলিস্তিনদের পক্ষে সমর্থন করে আসছে তাদের কাছে নিঃসন্দেহে এটি একটি ঐতিহাসিক রায়। এ সমর্থন একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।

জাতিসংঘের ১৯৩টি রাষ্ট্রের মধ্যে ১৪৩টি রাষ্ট্রের সমর্থনের মাধ্যমে বিশ্বে একটি শক্তিশালী বার্তা প্রদান করা হয়েছে। যে রাষ্ট্রগুলো ফিলিস্তিনিদের স্বার্থের বিপক্ষে এতকাল ভোট দিয়েছে তাদের প্রতি একটি বিশেষ বার্তা। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বারবার ভেটো প্রয়োগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক জনমতের বিরুদ্ধে গিয়ে ফিলিস্তিনের বিরোধিতা করা হয়েছে, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের বিরোধিতা করা হয়েছে। এখানে আরও উল্লেখ করা যেতে পারে যে ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত রিয়াদ মনসুর বলেছেন, ‘আমরা শান্তি চাই, স্বাধীনতা চাই এবং এই হ্যাঁ ভোট বা ফিলিস্তিনিদের পক্ষে যে ভোট সেটি ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্বের পক্ষে ভোট, এটি কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ভোট নয়। বরং এটি শান্তি প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে এক ধরনের বিনিয়োগ হিসেবে দেখা যেতে পারে।’ স্বাভাবিকভাবে ইসরাইল এ ব্যাপক সমর্থনকে একটি ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করছে যা দেশটি বরাবরই করে থাকে।

ইসরাইলের রাষ্ট্রদূত ক্ষোভে জাতিসংঘের সনদ ছিঁড়ে ফেলেছেন এবং সারা বিশ্বের সামনে এ দেশটির আগ্রাসী ও ভয়ংকর মনোভাব প্রদর্শন করেছেন। অর্থাৎ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে অত্যন্ত গণতান্ত্রিক উপায়ে যে ভোটাভুটি হয়েছে, যেখানে ১৪৩টি রাষ্ট্র ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের পক্ষে রায় দিয়েছে সে রায়কে প্রত্যাখ্যান করেছে, নিন্দা করেছে। এটিকে কটাক্ষ করার মাধ্যমে ইসরাইল নিজের প্রকৃত চরিত্র উন্মোচন করেছে।

১৯৪৮ সাল থেকে ফিলিস্তিনিদের সংগ্রাম এবং যে সংগ্রামের অন্যতম উদ্দেশ্য তাদের স্বাধীনতা, তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা সেখানে জাতিসংঘের এ সবশেষ রায় একটি বড় মাইলফলক। এটি ফিলিস্তিন এবং মুসলিম দেশগুলোর কূটনীতির একটি বিশাল বিজয়।

জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলো ইসরাইলের ক্রমাগত নিপীড়ন, আগ্রাসন ও গণহত্যার বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে মাত্র ৯টি দেশ এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে যার মাধ্যমে এ রাষ্ট্রগুলো কার্যত আন্তর্জাতিক জনমতের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে কূটনৈতিক দিক থেকে তাদের জন্য অস্বস্তিকর এবং আত্মঘাতী। সার্বিক বিবেচনায় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের এ রায়টি ঐতিহাসিক ও আশাব্যঞ্জক। বিশ্ব সম্প্রদায় এ আশাবাদ ব্যক্ত করতে চায় যে, অচিরেই ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইসরাইলের ক্রমাগত নিষ্ঠুরতা ও গণহত্যার অবসান ঘটবে।

– ড. দেলোয়ার হোসেন: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; প্রেষণে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সদস্য হিসেবে নিয়োজিত।

প্রকাশিত সময়ের আলো [লিংক]