From Palestine to Myanmar: Why Is the World Community Silent?

184

বর্তমান বিশ্বে অন্তত তিনটি ভয়াবহ সামরিক সংঘাত বিরাজ করছে। মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি বিঘ্নিত করে, মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রকে বদলে দিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের শান্তিপ্রিয় ফিলিস্তিন নাগরিকদের নিজ ভূমি থেকে উত্খাত করে ১৯৪৮ সালে ইসরাইল যে রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়, সে রাষ্ট্রটি বর্তমানে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নয়, গোটা বিশ্বের জন্যই এক ভয়াবহ নিষ্ঠুরতার উদাহরণ তৈরি করেছে। গাজা পরিস্থিতি নিয়ে সারা পৃথিবীতে ব্যাপক উদ্বেগ ও নিন্দা প্রকাশ করা হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ সবাই ইসরাইলের শাসকগোষ্ঠীর নিষ্ঠুরতা, বিশেষ করে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে কথা বলছেন।

বর্তমানে গাজায় ইসরাইলের নিষ্ঠুরতম গণহত্যা চলছে। ইসরাইলের এই নিষ্ঠুরতাকে হিটলারের হলোকস্টের সঙ্গে কেউ কেউ তুলনা করছেন। ইসরাইলের তথাকথিত আত্মরক্ষার নামে গাজাবাসীর ওপর যে  হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, সেটির কোনো ধরনের অজুহাতের সুেযাগ নেই। ৭ অক্টোবর হামাসের যে ভয়াবহ আক্রমণ সংঘটিত হয়েছিল, সেই আক্রমণের জবাব হিসেবে ইসরাইল যা করছে, যে ধরনের গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে, সেটি কখনোই এর উত্তর হতে পারে না। ফিলিস্তিনিদের ইতিহাস কিংবা বর্তমান যুদ্ধের ইতিহাস ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হয়নি। ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এই যুদ্ধের ইতিহাস শুরু, গণহত্যা শুরু। আমরা দেখেছি কীভাবে ইসরাইল একের পর এক নিরীহ ফিলিস্তিনিদের ওপর আক্রমণ করেছে, কীভাবে তাদের ভূমি দখল করেছে, কীভাবে তাদের জীবিকা ছিনিয়ে নিয়েছে, তাদের আত্মপরিচয়, তাদের ইতিহাসকে ধ্বংস করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর থেকেই গাজা পশ্চিম তীর অবরুদ্ধ করে রেখেছে। তারা ভবিষ্যতের জন্য ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এরকম নিষ্ঠুরতা একবিংশ শতাব্দীতে অকল্পনীয়।

অন্যদিকে ইউক্রেনে চলছে আরেক নিষ্ঠুরতা। ইউক্রেনের সাধারণ জনগণ প্রতিনিয়ত ভয়াবহ  যুদ্ধের মাঝে দিন কাটাচ্ছে। যদিও এই যুদ্ধটি এখন পর্যন্ত ইউক্রেনের ভেতরেই সীমাবদ্ধ কিন্তু এই যুদ্ধের বৈশ্বিক এবং আঞ্চলিক প্রভাব  বিশ্বযুদ্ধের মতোই তৈরি করছে। এই যুদ্ধের ফলে বিশ্ব অর্থনীতি চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধের ফলে বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে অবিশ্বাস ও বৈরিতা  বেড়েছে এবং এর প্রভাবে বাংলাদেশসহ বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ এক চরম অর্থনৈতিক বঞ্চনা ও সংকটের মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছে। অন্যদিকে বিশ্বের দীর্ঘমেয়াদি শান্তির সম্ভাবনা ধ্বংস করা হয়েছে। কারণ এই যুদ্ধে একদিকে রাশিয়া, অন্যদিকে পশ্চিমা বিশ্ব। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ন্যাটোর মাধ্যমে সম্মিলিত সমর্থন ইউক্রেনকে দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে রাশিয়া তার সমস্ত শক্তিমত্তা দিয়ে এই যুদ্ধ করছে। এই মুহূর্তে দেখা যাচ্ছে এই যুদ্ধটি একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে রূপ নিচ্ছে এবং যুদ্ধটি বন্ধ করার কোনো প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে না। ইতিমধ্যে এই যুদ্ধটি দুই বছর অতিক্রম করেছে। বর্তমান সময়ে দীর্ঘকাল ধরে একটি যুদ্ধ চলতে থাকা নিঃসন্দেহে একটি ভয়ংকর বিষয়। এই যুদ্ধের ভূরাজনৈতিক পরিণতি বিশ্বে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

অন্যদিকে আরেকটি নিষ্ঠুর যুদ্ধ চলছে বাংলাদেশের প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমারে। মিয়ানমার বরাবরই সামরিক জান্তাশাসিত একটি দেশ। এখানে বার্মারা ৬৮ শতাংশ জনসংখ্যাকে প্রতিনিধিত্ব করে এবং তার বাইরে ৩২ শতাংশ জনসংখ্যা মূলত বিভিন্ন উপজাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ। মিয়ানমার সরকার কর্তৃক ঘোষিত ১৩৫টি বৃহত্ আকারের উপজাতি দেশটিতে আছে যারা স্বাধীনতার জন্য, স্বায়ত্তশাসনের জন্য প্রতিনিয়ত লড়াই করছে। মিয়ানমারের ভেতর গৃহযুদ্ধ, বিদ্রোহ ক্রমাগত চলছে। এসবের মধ্য দিয়ে মিয়ানমারের রাজনৈতিক সংস্কার বা রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেনি।

মিয়ানমারে সাম্প্রতিক কালের সামরিক জান্তাবিরোধী নজিরবিহীন প্রতিরোধ আন্দোলনের ফলে এই মুহূর্তে মিয়ানমারে দাবানলের মতো যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে সাধারণ মানুষ এখন অসহায়। লক্ষ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত এবং কত মানুষ মৃত্যুবরণ করছে তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যানও পাওয়া যাচ্ছে না। রাখাইনসহ কয়েকটি রাজ্যে তুমুল যুদ্ধ চলতে দেখা যাচ্ছে। সেই যুদ্ধে জান্তারা অনেকটাই পিছু হটছে। এখন পর্যন্ত জান্তাদের ১৮০টি সামরিক ঘাঁটি ও ৯টি গুরুত্বপূর্ণ শহর দখল করেছে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো। বিভিন্ন গ্রাম, শহরও তাদের দখলে এসেছে। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী মিয়ানমারে ৮০ শহরে ইন্টারনেট ও ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। অন্যদিকে জান্তারাও স্থলপথ, নৌপথে পালটা আক্রমণ করছে। ফলে দেশটিতে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ চলছে। জনসংখ্যার বিচারে ৫ কোটি ৭০ লাখের একটি দেশ মিয়ানমার। এতগুলো মানুষের জীবনে নেমে এসেছে ভয়ংকর এক পরিস্থিতি। সাধারণ নাগরিকদের জোর করে যুদ্ধে জড়ানো হচ্ছে, রোহিঙ্গাদের ওপরও চাপ সৃষ্টি করে যুদ্ধে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এক চরম অমানবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এখানে, যেদিকে বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টিপাত করা প্রয়োজন কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।

উপর্যুক্ত তিনটি পরিস্থিতিতেই বিশ্ব মোড়ল  রাষ্ট্রগুলো কিংবা জাতিসংঘ কিংবা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রক্রিয়া বা আঞ্চলিক বিভিন্ন সংস্থা তাদের কারোরই কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। চরম মানবিক বিপর্যয় কিংবা যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। বিশ্ব রাজনীতিতে সব সময়ই যুদ্ধ কিংবা নিরাপত্তার হুমকি ছিল। কিন্তু এই হুমকিগুলো মোকাবিলা করার জন্য পাশাপাশি শান্তি আলোচনা চলেছে এবং সময় লাগলেও একপর্যায়ে সফলও হয়েছে। আমরা দেখেছি স্নায়ুযুদ্ধের সময় বা তার আগে এরকম পরিস্থিতি যখন হয়েছে, তখন পালটা একটি শান্তির প্রচেষ্টাও ছিল। বিশেষ করে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমরা দেখেছি একদিকে যেমন যুদ্ধ ছিল অন্যদিকে শান্তি আলোচনা ছিল। ভিয়েতনাম যুদ্ধ, কোরিয়া যুদ্ধ, আফগানিস্তান যুদ্ধ, ইরাক-ইরান যুদ্ধসহ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধের ক্ষেত্রেও আমরা একধরনের শান্তি আলোচনা দেখেছি। তখন বিশ্বনেতৃত্বের মধ্যে যে ধরনের দূরদর্শিতা ছিল, সেটি বর্তমানে দেখা যাচ্ছে না। বিশ্বে নেতৃত্বের একটি বড় ধরনের সংকট আমরা দেখতে পাচ্ছি এই তিনটি পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতির মাধ্যমে। যেখানে আমরা প্রতিমুহূর্তে সভ্যতার কথা বলছি, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের কথা বলছি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কথা বলছি, পরিবর্তনের কথা বলছি, সেখানে এরকম একটি বিশ্ব নিশ্চয়ই কেউ প্রত্যাশা করেন না। এটি যদি আমরা সভ্যতার জায়গা থেকে বিবেচনা করি, মানবতার জায়গা থেকে দেখার চেষ্টা করি, তাহলে দেখা যাচ্ছে বিশ্বব্যবস্থা কিংবা বিশ্বসম্প্রদায় যেভাবেই আমরা বলিনা কেন, একটি অসাড় ও আত্মকেন্দ্রিক নেতৃত্ব বিশ্বে দেখা যাচ্ছে, যারা নিজের দেশের উন্নয়ন ছাড়া বা নিজের দেশের শক্তি বৃদ্ধি ছাড়া, বা নিজের দেশের রাজনীতির ভেতর ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে তাদের আগ্রহ আমরা দেখছি না। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার নামে, বহুপাক্ষিকতার নামে কিংবা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার কার্যকারিতার নামে মূলত একধরনের আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে  এবং কার্যকরভাবে কোনো সংকট মোকাবিলা বা বন্ধ করার কোনো তত্পরতা আমরা দেখছি না। যে ধরনের নমনীয়তার প্রয়োজন, যে ধরনের দূরদর্শিতা ও সাহসের প্রয়োজন, মানসিকতার প্রয়োজন, সেটি অনুপস্থিত দেখতে পাচ্ছি। ফলে বিশ্বসম্প্রদায়ের মাঝে মোড়ল শক্তিগুলোর চরম ব্যর্থতা আমরা দেখতে পাচ্ছি।

এটিও স্বীকার্য যে, বিশ্বের সাধারণ জনগণ, বিশ্বের নাগরিক সমাজ অত্যন্ত সোচ্চার। তাদের হাতে ক্ষমতা নেই কিন্তু প্রতিবাদের ভাষা আছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্নভাবে তারা প্রতিবাদ করছেন। এমনকি বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এই গাজা পরিস্থিতি কিংবা ইউক্রেন যুদ্ধ কিংবা বিশ্বের আরো যে ধরনের মানবিক সংকট রয়েছে সেগুলোর ক্ষেত্রে মানবতার পক্ষে কথা বলছেন। কিন্তু ঐ রাষ্ট্রগুলোর নীতিগত কোনো অবস্থান পরিবর্তনে সহায়তা করছে না। ফলে একদিকে বিশ্বের সাধারণ নাগরিক সমাজ এই ধরনের যুদ্ধ, রক্তপাত কিংবা অমানবিকতার বিরুদ্ধে কথা বলছেন, অন্যদিকে যাদের হাতে ক্ষমতা, যাদের হাতে নেতৃত্ব, আইন; তারা নীরব ভূমিকা পালন করছেন। এই পরিস্থিতির দ্রুত অবসান হোক, সেটি আমরা কামনা করছি।

– ড. দেলোয়ার হোসেন: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; প্রেষণে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সদস্য হিসেবে নিয়োজিত।

প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেফাক [লিংক]