How Far the Conference in Munich Will Ensure Global Security?

368

মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনের রয়েছে দীর্ঘ ষাট বছরের ইতিহাস। ১৯৬৩ সালে পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলো থেকে মূলত অংশগ্রহণ করা হতো এবং এ সম্মেলনের মাধ্যমে পশ্চিমা বিশ্বের যেসব হুমকি এবং নিরাপত্তা সংকট ছিল, সেগুলো নিয়ে আলোচনার উদ্দেশ্যেই মূলত মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনের যাত্রা শুরু। প্রতিষ্ঠার সময়টিই বলে দিচ্ছে, স্নায়ুযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এ সম্মেলনের উৎপত্তি এবং বরাবরই সম্মেলনটি একটি অনানুষ্ঠানিক প্লাটফর্ম, যার মাধ্যমে ইউরোপের নিরাপত্তার বিষয়গুলো তখনকার পরিপ্রেক্ষিতে আলোচিত হয়েছে। এ সম্মেলনের একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এখানে বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান, রাজনীতিক, কূটনীতিক একত্র হন এবং একটি অনানুষ্ঠানিক পরিবেশে এ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়। প্রথম কয়েক দশক আলোচনা মূলত স্নায়ুযুদ্ধের প্রভাবের মধ্যেই সীমিত ছিল এবং সেখানে একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যদিকে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার দ্বন্দ্ব, প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা মুখ্য বিষয় ছিল এবং তাকে কেন্দ্র করে ইউরোপের উদ্বেগ এবং শঙ্কা ছিল। আমরা জানি, ইউরোপ তখন পশ্চিম ইউরোপ এবং পূর্ব ইউরোপে বিভক্ত ছিল। পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ অবস্থানে ছিল এবং এখনো যা বজায় আছে। এ সম্মেলন ইউরোপভিত্তিক একটি প্লাটফর্ম, যেটি ইউরোপের নিরাপত্তা এবং চ্যালেঞ্জগুলো বিশ্লেষণের সুযোগ তৈরি করে। সেখান থেকে বিভিন্ন বিষয় আলোচনার পর পশ্চিমা বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রগুলো তাদের পররাষ্ট্রনীতিতে বাস্তবায়নের চেষ্টা করে।

নিরাপত্তা সম্মেলনের বিষয়টি স্নায়ুযুদ্ধের পরে ধীরে ধীরে তার একটি ব্যাপ্তি লাভ করে এবং স্নায়ুযুদ্ধের পর থেকে যত বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়েছে, এ মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলন তত বেশি বৈশ্বিক রূপ ধারণ করেছে। মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে একসময় রাশিয়া একটি সক্রিয় ও শক্তিশালী অংশগ্রহণকারী ছিল। দীর্ঘ সময় ধরে মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনের মূল উপজীব্য ছিল ইউরোপের বাইরের যে বিশ্ব, অর্থাৎ আফগানিস্তান, ইরাক কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা এবং একই সঙ্গে স্নায়ুযুদ্ধের পর রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের যে সুসম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, সেটিকে আরও বেশি শক্তিশালী করা। তার সূত্র ধরে সেই সম্পর্ককে কীভাবে আরও শক্তিশালী করা যায় সেই চেষ্টা করা। আমরা জানি, রাশিয়া ইউরোপের সঙ্গে ক্রমাগত আরও বেশি যুক্ত হয়েছে, রাশিয়াকে জি-সেভেনের সঙ্গে যুক্ত করে জি-৮ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। রাশিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন নিয়মিত এ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছেন এবং এ সম্মেলনেই রাশিয়ার সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ স্টার্ট চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিটি স্বাক্ষর করেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তখনকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিন্টন এবং রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ। পুতিন বরাবরই এ নিরাপত্তা সম্মেলনে বক্তব্য দিয়েছেন। এ বক্তব্যের মাধ্যমেই আমরা দেখতে পাই, ইউরোপকেন্দ্রিক এ নিরাপত্তা সম্মেলনটি মূলত আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো নিয়ে ব্যস্ততা ছিল।

কিন্তু গত দুই বছর অর্থাৎ ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে নিরাপত্তা সম্মেলনের পরিপ্রেক্ষিত, আলোচ্য বিষয় এবং নিরাপত্তা সম্মেলনের ভবিষ্যৎ করণীয় সবকিছুই পালটে যায়। ফলে বর্তমান বিশ্বের একটি জটিল সময়ে এ নিরাপত্তা সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং এটি অতীতের চেয়ে অনেক বড় পরিসর ধারণ করেছে। এ সম্মেলনটি একসময় পশ্চিমা দেশগুলোকে কেন্দ্র করে হলেও এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিভিন্ন দেশ সেখানে অংশগ্রহণ করছে। পুতিন একসময় নিয়মিত এ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করলেও এখন সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে তার অবস্থান। সেদিক থেকে মিউনিখ সম্মেলনে যে বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে, সেটি মূলত ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার যে হুমকি, সেই হুমকির বিষয়টি। বিশ্ব নিরাপত্তা বা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ধারণার ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। একসময় রাশিয়াকে নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করা হতো না, কিন্তু এখন রাশিয়া অন্যতম হুমকি। ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে ইউরোপের ভেতরে একদিকে যেমন রাশিয়াবিরোধী অবস্থান তৈরি হয়েছে, একই সঙ্গে এ যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ফলে ইউরোপের ভেতরেও মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ন্যাটোর ভেতরে যে ঐক্য ছিল, সেটিও বড় ঝুঁকির মধ্যে আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের বিষয়টিও চাপে আছে। ফলে ইউক্রেনকে সমর্থন করে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া অর্থনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। অস্ত্র এবং অর্থ দুটোই ইউক্রেনকে ব্যাপকভাবে দিতে হচ্ছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখানে একটি বড় ভূমিকা পালন করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেটি পালন করলেও সার্বিকভাবে পশ্চিমা বিশ্বেরই বড় ধরনের সহযোগিতার মাধ্যমেই ইউক্রেন যুদ্ধকে একটি সমান অবস্থানে রাখা হয়েছে। তা না হলে রাশিয়ার আক্রমণের প্রেক্ষাপটে ইউক্রেন হয়তো অনেক আগেই পরাজিত হয়ে পড়ত।

ইউক্রেন যুদ্ধের পাশাপাশি গাজা যুদ্ধ চলছে, যেখানে ইসরাইল মানবতার চরম সংকট তৈরি করেছে। কেউ কখনো কল্পনাও করতে পারিনি; এ যুদ্ধ এতটা ভয়ংকর রূপ ধারণ করবে। এ পর্যন্ত ২৯ হাজারেরও বেশি নিরীহ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হয়েছে। একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে প্রায় খাঁচাবন্দি করে নিরীহ মানুষগুলোকে হত্যা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক আদালত ইসরাইলের বিরুদ্ধে গণহত্যার রায় দিলেও ইসরাইল তাতে কর্ণপাত করেনি বরং রাফাতে নতুনভাবে আক্রমণ করছে। ইসরাইলের এ আক্রমণের সূত্র ধরে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সংকট তৈরি হয়েছে এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্যই এখন উত্তপ্ত। লোহিত সাগর অঞ্চলে চলাচলকারী জাহাজের ওপর আক্রমণ হচ্ছে। হুথিদের সক্রিয়তা যেমন দেখা যাচ্ছে, তা দমন করার জন্য আক্রমণও হচ্ছে। ইয়েমেন সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। ফলে এরকম একটি অবস্থায় মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনের গুরুত্ব ব্যাপক। বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় যেমন অর্থনৈতিক সংকট রয়েছে, তেমনি রয়েছে নিরাপত্তা সংকট। বিশ্বব্যাপী নতুন করে সংকট তৈরি হয়েছে। যেমন পূর্ব এশিয়া থেকে শুরু করে পূর্ব ইউরোপ কিংবা রাশিয়া অঞ্চলে। এর ফলে অর্থনীতি বিপর্যস্ত হচ্ছে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যে সম্পর্কের পরিবর্তন ঘটছে, মেরুকরণের প্রভাব তৈরি হচ্ছে। ফলে এ মেরুকরণ ও নিরাপত্তার সংকট থেকে বিশ্বকে কীভাবে একটি শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতির দিকে, শান্তিপূর্ণ ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে নেওয়া যায়, সেটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

এ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বের একজন অন্যতম রাষ্ট্রনায়ক হিসাবে অংশ নিয়েছেন। তিনি এ সম্মেলনে ‘ফ্রম পকেট টু প্ল্যানেট: স্কেলিং আপ ক্লাইমেট ফাইন্যান্স’ শীর্ষক একটি প্যানেল আলোচনায় বক্তৃতা ও ছয়টি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য জলবায়ু অর্থায়ন ছাড় করতে এবং অস্ত্র প্রতিযোগিতা বন্ধ করে সে অর্থ জলবায়ু তহবিলে জমা দিতে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানান। পাশাপাশি তিনি বেশ কয়েকজন বিশ্বনেতার সঙ্গে বৈঠক করেন। বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিঃসন্দেহে একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সর্বপ্রথম এরকম একটি সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন ২০১৭ সালে এবং পরবর্তীকালে ২০১৯ সালেও তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর জন্য এটি নতুন অভিজ্ঞতা নয়। নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সরব পদচারণা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা এ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণের মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি। ২০২৪ সালে যে সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেখানে বিশ্বের প্রায় ৫০টি দেশের সরকারপ্রধান যোগ দিচ্ছেন এবং প্রায় ১০০ মন্ত্রী যোগ দিয়েছেন। তার বাইরেও অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এ সম্মেলনে অংশ নেন।

সম্মেলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, আলোচনার জন্য কতগুলো বিষয় আগে থেকে নির্ধারণ করা থাকে এবং সেগুলো অনেকটা গবেষণার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয় এবং তার ওপর ভিত্তি করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। সেই প্রতিবেদনটি মূলত আলোচনার প্রধান বিষয়বস্তু হিসাবে দেখা যায়। যেমন এবারের আলোচনার মূল বিষয় হচ্ছে মিউনিখ নিরাপত্তা প্রতিবেদন ২০২৪, যার শিরোনাম নাম হচ্ছে Lose-Lose অর্থাৎ নিরাপত্তার দিক থেকে বিশ্ব এমন একটি অবস্থানে আছে, যে পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশ বা অঞ্চল ক্রমাগত অবনতির দিকে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে এসে একটি ভালো অবস্থায় যাওয়ার অবস্থা দেখা যাচ্ছে না। বৃহৎ শক্তিগুলো যেভাবে আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো দেখছে, তাতে তারা বরং ক্রমাগত পরস্পরের ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। সেখান থেকে বিজয়ী হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। আমরা জানি, কূটনীতিতে বা আন্তর্জাতিক দরকষাকষিতে উইন-উইন একটি অবস্থার কথা বলা হয়, যেখানে সবপক্ষই কোনো না কোনো ধরনের সুবিধা অর্জন করতে পারে। আবার জয়-পরাজয় অবস্থার কথাও বলা হয়, যেখানে কোনো পক্ষ বিজয়ী হবে আবার অন্যপক্ষ পরাজিত হবে; কিন্তু মিউনিখ নিরাপত্তা প্রতিবেদনের গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, এখানে তারা বলছে, সবাই পরাজিত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিকে এ প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।

এ প্রতিবেদনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে। একদিকে যেমন ইউরোপ, ইন্দো-প্যাসেফিক, আফ্রিকা কিংবা এশিয়া এসব অঞ্চলের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়সহ অন্যান্য বিষয়ের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। ফলে এ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আমরা জানি, এবারের সম্মেলন ছিল ৬০তম সম্মেলন এবং আরও ৫৯টি সম্মেলন অতীতে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ফলে এ মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনের এক ধরনের ধারাবাহিকতা আমরা লক্ষ করি। ১৯৬৩ সালে যাত্রা শুরু হলেও এ সম্মেলন কখনোই বন্ধ থাকেনি। তবে বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে যে সম্মেলন হয়েছে, সেখানে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে, সম্মেলনের বা এজেন্ডার প্রসার ঘটেছে। এ নিরাপত্তা সম্মেলন স্নায়ুযুদ্ধের পরে উন্নয়নশীল বিশ্ব কিংবা দক্ষিণের অঞ্চল বা পশ্চিমা বিশ্বের বাইরের অঞ্চলের দিকেও নজর দেওয়া হতো। তবে এবারের সম্মেলন ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইউরোপের যে সংকট সেটি সামনে উঠে এসেছে, তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ইন্দো-প্যাসেফিক অঞ্চলের নিরাপত্তার বিষয়টি। সেখানে চীন এবং রাশিয়ার প্রসঙ্গ গুরুত্বসহকারে উঠে এসেছে। যেহেতু অনেক দেশই সেখানে অংশগ্রহণ করছে, তাই প্রতিটি দেশেরই তাদের নিজস্ব মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার সুযোগ রয়েছে। সেদিক থেকে এটি একটি বড় ধরনের নিরাপত্তা কূটনীতির মঞ্চ।

বাংলাদেশ যে বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়েছে, তা হচ্ছে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান। এ সম্মেলন ইউরোপের একটি দেশে অনুষ্ঠিত হলেও এটি মূলত ইউরোপে বাংলাদেশের উন্নয়ন অংশীদার রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও উন্নত করার একটি সুযোগ তৈরি করেছে। প্রধানমন্ত্রী জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শোলৎজ, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি, নেদারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মার্ক রুট, আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ, কাতারের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান আল-থানি এবং ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন। একদিকে যেমন জার্মানির সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করার বিষয় নিশ্চয় আলোচনা হয়েছে, পাশাপাশি ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, ইতালি, নেদারল্যান্ডস এসব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার আলোচনা হয়েছে এবং অন্যান্য দেশ থেকে যেসব নেতা এসেছেন, তাদের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রী আলোচনা করার সুযোগ পেয়েছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশের সাফল্য, বিশেষ করে জলবায়ু মোকাবিলা, আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা, একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় বাংলাদেশের অর্জন সবাইকে অবহিত করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

বর্তমান বিশ্বে গ্লোবাল সাউথ বা দক্ষিণের দেশগুলোর অর্থনৈতিক সংকট এবং এ সংকট ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যকার যে দ্বন্দ্ব, তার ফলেই তৈরি হয়েছে-এ বিষয়গুলো নিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জোরালো বক্তব্য রেখেছেন। বিশ্বকে কীভাবে আরও শান্তিপূর্ণ করা যায়, স্থিতিশীল করা যায়, বিশ্বের নিরাপত্তা কীভাবে বৃদ্ধি করা যায় এবং সেই ক্ষেত্রে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের এগিয়ে আসা, বাংলাদেশের রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলার বিষয়, গাজা যুদ্ধে নিরীহ ফিলিস্তিনিদের হত্যা এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলোর ওপর প্রধানমন্ত্রী আলোকপাত করেছেন। তবে নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক, জার্মানি, ইতালি, আজারবাইজানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকগুলোর মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কোন্নয়নে বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে প্রধানমন্ত্রীর এ সফর। মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে যোগ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের অর্জন, বাংলাদেশের নিরাপত্তা দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি বিশ্বে কীভাবে আরও বেশি শান্তি, স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা যায়, তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ধারণা এবং বক্তব্য প্রদান করেছেন। মিউনিখ সম্মেলনের মাধ্যমে বিশ্বের নিরাপত্তার বিষয়ে যে ব্যাপক গুরুত্ব দেখা যাচ্ছে, তার সামগ্রিক প্রতিফলন দেখার অপেক্ষায় রয়েছে বিশ্ব।

– ড. দেলোয়ার হোসেন: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; প্রেষণে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সদস্য হিসেবে নিয়োজিত।

দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত [লিংক]