Post-Election Global Response

203

বাংলাদেশে গত ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন অত্যন্ত দক্ষতা ও সফলতার সঙ্গে একটি কঠিন নির্বাচন পরিচালনা করেছে। এটি বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এ নির্বাচন ঘিরে দেশ-বিদেশে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা ছিল এবং এটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক ছিল। সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার অংশ। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১ সালের পর থেকেই বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক ধারায় পরিচালিত হয়ে আসছিল, সেই ধারা অনুযায়ী ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর স্বল্পতম সময়ে একটি অত্যন্ত প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক সংবিধান রচনা করে, যা ৪ নভেম্বর ১৯৭২ সালে গৃহীত হয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, সমাজ ও জাতি প্রতিষ্ঠার পথ পরিক্রমা শুরু করেন। সেই পরিক্রমায় বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যার মাধ্যমে ওয়েস্টমিনিস্টার পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থায় বাংলাদেশ এগিয়ে চলে।

বাংলাদেশের নির্বাচন এবং নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্বের সব প্রান্ত থেকে প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যাচ্ছে। গত ১৫ বছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে উত্থান এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে বাংলাদেশের ভূমিকা সমগ্র বিশ্বে ব্যাপক স্বীকৃতি পেয়েছে। নির্বাচনের আগে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ অন্যান্য দেশের আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের অসাধারণ রূপান্তরের কথা ব্যাপকভাবে উচ্চারিত হয়েছে। বাংলাদেশের নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে নির্বাচন ও নতুন সরকার বিষয়ে বাংলাদেশের বন্ধু রাষ্ট্র ও উন্নয়ন অংশীদারগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি এরই মধ্যে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী বন্ধু রাষ্ট্রসমূহ তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। এ বিষয়টি সবারই জানা আছে যে, বিশ্বরাজনীতিতে নতুন মেরূকরণ চলছে, ঠান্ডা লড়াইয়ের নতুন বাস্তবতা লক্ষণীয়। গত প্রায় এক দশক ধরে এই প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। বাংলাদেশের কূটনীতিতে এই বৈশ্বিক বাস্তবতায় কিছুটা প্রভাব পড়লেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহসী ও দূরদর্শী নেতৃত্বে সব পক্ষের সঙ্গে বাংলাদেশ শক্তিশালী সম্পর্ক বিনির্মাণ করতে পেরেছে। নির্বাচনোত্তর আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার এ বিষয়টি পরিষ্কারভাবে দৃশ্যমান। নির্বাচনোত্তর বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার কয়েকটি বিশেষ দিক বিশ্লেষণ করা যেতে পারে।

প্রথমত, পূর্ব থেকে পশ্চিম, উত্তর থেকে দক্ষিণ বিশ্বের সব প্রান্ত থেকে বাংলাদেশের নির্বাচন ও নতুন সরকার বিষয়ে গঠনমূলক ও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যায়। প্রতিক্রিয়ার ভাষা ও বিষয়বস্তুর মধ্যে পার্থক্য পরিলক্ষিত হলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি অবিচল আস্থার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। ভারত, চীন এবং রাশিয়া জোরালোভাবে বাংলাদেশের নির্বাচন ও নির্বাচনের ফলাফল দেশটির গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণের বিষয়টি গুরুত্ব দিলেও সার্বিকভাবে এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা স্বীকার করে নিয়েছে। দ্বিতীয়ত, সব পক্ষই বাংলাদেশের সঙ্গে তথা নতুন সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। অর্থাৎ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইইউর বিবৃতির মধ্যে বিষয়টি পরিষ্কার। ভারত, চীন ও রাশিয়া দ্ব্যর্থহীনভাবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী ও অর্থবহ করার ঘোষণা দিয়েছে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্জন ও প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বের বিষয়টি বিবেচনা করলে এ ধরনের প্রতিক্রিয়া সহজেই অনুমেয়।

তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার আরও একটি অসাধারণ বিষয় হচ্ছে রাজনৈতিক ও নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান। কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্বার্থে যে ধরনের ভয়াবহ সহিংসতা ঘটেছে, তা অবশ্যই নিন্দনীয়। বিশেষ করে বাস ও রেলের বগিতে নৃশংস অগ্নিসংযোগ এবং পুলিশ সদস্যসহ সাধারণ নাগরিকদের আন্দোলনের নামে হত্যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাদের প্রতিক্রিয়ায় সন্ত্রাসবাদ ও সহিংসতার বিরুদ্ধে পরিষ্কার অবস্থান ব্যক্ত করেছে। চতুর্থত, সহিংসতাবিরোধী নীতির সঙ্গে সংগতি রেখে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের নির্বাচনটি শান্তিপূর্ণ ও মুক্ত পরিবেশে অনুষ্ঠিত হওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েছে। সব পক্ষই এ বিষয়ে তাদের সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে ভারত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করেছে। উন্নয়নশীল বিশ্বে নির্বাচন পরিচালনা একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিরাজমান মতপার্থক্য, বিবাদ, তিক্ততা ও বৈরিতা নির্বাচনের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। যার দরুন শান্তি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার সমূহ আশঙ্কা থাকে। বাংলাদেশে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এ ক্ষেত্রে একটি অসাধারণ সাফল্য দেখিয়েছে। সহিংসতার কিছু ঘটনা ঘটলেও নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে।

পঞ্চমত, বৃহৎ শক্তির বাইরেও বাংলাদেশের নির্বাচন ও নতুন সরকারকে স্বাগত জানিয়েছে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, আসিয়ান দেশগুলো, ওআইসি সদস্য রাষ্ট্রগুলো, গালফ দেশগুলো ও লাতিন আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ শক্তি ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা। কমনওয়েলথ মহাসচিব আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়েছেন। জাতিসংঘের প্রতিক্রিয়াটি রক্ষণশীল ও বলা যায় ব্যক্তিগত বিশ্বাস দ্বারা প্রভাবিত। তবে জাতিসংঘও বাংলাদেশের রাজনীতিতে সহিংসতার বিরুদ্ধে কথা বলেছে এবং দেশের সব পক্ষকে এ ক্ষেত্রে অবদান রাখার ওপর জোর দিয়েছে। একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও জাতিসংঘের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয়ে হস্তক্ষেপের কোনো সুযোগ নেই। তা ছাড়া গত এক দশকে জাতিসংঘের ব্যর্থতা আকাশচুম্বী। ফিলিস্তিন সমস্যা, গাজা যুদ্ধ, রোহিঙ্গা সমস্যা, ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে শুরু করে বর্তমান বিশ্বের কোনো আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংকট মোকাবিলার ক্ষেত্রে জাতিসংঘ কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। জাতিসংঘের উচিত এ সমস্যা মোকাবিলায় আরও সক্রিয় ও মনোযোগী হওয়া।

পরিশেষে, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনৈতিক, ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ সবসময় একটি বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন পক্ষের স্বার্থের সমীকরণ ভিন্ন। বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পারস্পরিক স্বার্থের বিষয়টি যে কোনো বৃহৎ শক্তির বিবেচনার বিষয়। অন্যদিকে বৃহৎ শক্তিগুলোর স্বার্থ অর্জনের জন্য কূটনৈতিক কৌশল যথেষ্ট ভিন্ন। ফলে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে মার্কিন নীতি কিংবা ভারতের নীতি কিংবা রাশিয়ার নীতির মধ্যে পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। এ বিষয়টি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ওপরও প্রভাব পড়ে থাকে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পক্ষ ও শক্তিগুলোর ভিন্ন ভিন্ন কৌশল বা দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঘটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশের নির্বাচন এ বাস্তবতার বাইরে নয়।

নতুন সরকার বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’ তা অনুসরণ করেই বাংলাদেশ এগিয়ে নিয়ে যাবে এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ভারসাম্য এবং স্বাধীন সত্তা বজায় রাখার শক্তিশালী নীতি, যা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বজায় রাখছেন সেটিও আগামী দিনে আরও কঠোরভাবে পালন করা হবে। আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ এটি অনুধাবন করে যে, বাংলাদেশের সঙ্গে সব দেশ কাজ করতে চায়। এখানে কোনো একটি দেশ বা বিশেষ রাষ্ট্রকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। বিভিন্ন দেশের প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমেও আমরা সেটি দেখতে পাই। যুক্তরাষ্ট্র কিংবা যুক্তরাজ্যও বাংলাদেশের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে আগ্রহী। ভারত, চীন, রাশিয়া এবং জাপানসহ আরও অনেক দেশ বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে চায় এবং সেই ধরনের একটি প্রতিফলনই আমরা দেখেছি। সেটিকে মাথায় রেখেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্যগুলো আগামী দিনে বাস্তবায়িত হবে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে স্মার্ট বাংলাদেশ বাস্তবায়নের যে রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়েছে, তার দিকে দেশ আরও একধাপ এগিয়ে যাবে।

– ড. দেলোয়ার হোসেন: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; প্রেষণে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সদস্য হিসেবে নিয়োজিত।

প্রকাশিত দৈনিক কালবেলা [লিংক]