World Politics: Approaching towards Crisis and Uncertainty

0
170

বিশ্ব রাজনীতিতে একটি ঘটনাবহুল বছর ছিল ২০২৩। বিদায়ি বছরে বিশ্ব রাজনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন অঞ্চলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। কোনো ঘটনা অতীতের ঘটনার ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে, আবার অনেক নতুন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাও ঘটেছে।

বিশ্ব রাজনীতির সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতি, পরিবেশ, সংস্কৃতি, নিরাপত্তা ও শান্তি সবকিছুই একসূত্রে গাঁথা। ফলে বিশ্ব পরিমণ্ডলে ২০২৩ সালে যেসব ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোয় নানা বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায়। আবার বিশ্ব রাজনীতির যে চরিত্র, তাতে অনেক ঘটনাকে ব্যতিক্রমধর্মীও বলা যাবে না। মনে রাখতে হবে, ২০২৩-এর সঙ্গে ২০২২-এর একটি যোগসূত্র রয়েছে। একইভাবে ২০২২-এর সঙ্গে ২০২১-এর যোগসূত্র ছিল।

অন্যদিকে আমরা যদি বিশ্ব রাজনীতির ট্রাজেকটরি বা সময়কাল বিবেচনা করি, সেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর স্নায়ুযুদ্ধ, এরপর স্নায়ুযুদ্ধোত্তর কাল লক্ষ করা যায়। ২০০১ সালের নাইন-ইলেভেনের ঘটনার পর আরেকটি সময়কাল তৈরি হয়েছিল। আবার ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ইউক্রেন যুদ্ধের মাধ্যমে শুরু হয় আরেকটি নতুন পরিস্থিতি। একই সঙ্গে গত এক দশকে বিভিন্ন দেশের নেতৃত্বে পরিবর্তনের কারণেও বিশ্ব রাজনীতির প্রকৃতি ও ধরনের মধ্যে পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৬ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর বিশ্ব রাজনীতির একটি নতুন চিত্র দেখা গিয়েছিল।

নতুন অনেক অনুষঙ্গ, উপকরণ তৈরি হয়েছিল। যেমন সেসময়ে হঠাৎ করেই ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তিনি বৈঠক করবেন এবং সেই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে দুই দফা শীর্ষ বৈঠক হয়েছিল, যা অনেকের কাছেই ছিল অবিশ্বাস্য। দুই দফা বৈঠকেও এ দুদেশের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা ফলপ্রসূ হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে সম্পর্ক আগের অবস্থায়ই ফিরে গেছে।

২০২৩ সালে প্রথমত যে ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্ব রাজনীতি অনেকটাই আবর্তিত হয়েছে, সেটি হচ্ছে ইউক্রেন যুদ্ধ। এ যুদ্ধের ধারাবাহিকতা আমরা লক্ষ করেছি। ইউক্রেন যুদ্ধে কোন পক্ষ বিজয়ী হবে কিংবা যুদ্ধের ফলাফল কার দিকে যাবে অথবা যুদ্ধটি কীভাবে সমাপ্ত হবে, সেটি একটি বড় প্রশ্ন। আমরা লক্ষ করেছি, ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে দুটি প্রধান পক্ষ, একদিকে রাশিয়া অন্যদিকে পশ্চিমা বিশ্ব তাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করেছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের ব্যাপারে দুই ধরনের ধারণা ছিল। একটি ছিল রাশিয়া হয়তো ২০২৩ সালের শীতকালীন আক্রমণের মাধ্যমে ইউক্রেনকে পর্যুদস্ত করবে এবং যুদ্ধের ফলাফল দ্রুত রাশিয়ার পক্ষে নিয়ে আসবে। কিন্তু রাশিয়া সেই কাজটি করতে পারিনি। ইউক্রেন পশ্চিমা বিশ্বের সহায়তা নিয়ে সেই শীতের সময়টি অতিক্রম করেছে এবং রাশিয়ার ওপর পালটা আক্রমণ করেছে।

ইউক্রেন পশ্চিমা বিশ্ব থেকে অনেক উন্নতমানের অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ করেছে। অত্যাধুনিক ‘লিওপার্ড’ ট্যাংক তারা পেয়েছে। ফলে পশ্চিমা বিশ্ব থেকে অস্ত্র এবং আরও বেশি সহায়তা নিয়ে ইউক্রেন একটি পালটা হামলার চেষ্টা করেছে। এ পালটা আক্রমণের ব্যাপারে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি অনেক আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। পশ্চিমা বিশ্বকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন যে, ইউক্রেন যুদ্ধ একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি করবে। কিন্তু সেটি শেষ পর্যন্ত তারা করতে পারেনি। তারা পালটা আক্রমণে যে ধরনের সামরিক বিজয়ের কথা ভেবেছিল সেটি ঘটেনি। ফলে ইউক্রেন যুদ্ধে একধরনের অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হওয়ার মধ্য দিয়েই ২০২৩ সালের সমাপ্তি ঘটেছে।

ইউক্রেন যুদ্ধের পর ২০২৩ সালে আরেকটি ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যা হলো ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরাইলি হামলা। এর ফলে ২০২৩ সালের শেষদিকে এসে আমরা লক্ষ করেছি মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির ব্যাপক পরিবর্তন এবং এ পরিবর্তনটি নিশ্চিতভাবেই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্রের জন্ম হয় এবং জাতিসংঘের স্বীকৃতি লাভ করে। এ রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই শুরু হয় ফিলিস্তিন সংকট। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ইসরাইল ক্রমাগতভাবে ফিলিস্তিনি ও আরবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে এবং একাধিক যুদ্ধে ইসরাইল ভয়াবহতা ও নিষ্ঠুরতা দেখিয়েছে। অন্যদিকে বিশ্ব রাজনীতিতে গত তিন দশকে যে পরিবর্তন ঘটেছে, তার প্রেক্ষাপটে ফিলিস্তিনিদের ওপর আরও বেশি নিষ্ঠুরতা ও নিপীড়ন চালিয়েছে ইসরাইল। ইসরাইলের বৈষম্যমূলক ও নিপীড়নমূলক নীতির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তেমন কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি। ফিলিস্তিনিদের অধিকার, তাদের স্বাধীনতা, স্বাধীন রাষ্ট্রের আকাক্সক্ষা-সবকিছুর প্রতি বৃহৎ শক্তিগুলোর এক ধরনের নির্বিকার মনোভাব আমরা দেখেছি। এরই ধারাবাহিকতায় হামাস গত ৭ অক্টোবর গাজা থেকে একটি বড় ধরনের আক্রমণ ইসরাইলে সংঘটিত করে। এ আক্রমণ ছিল অবিশ্বাস্য এবং কল্পনার বাইরে। ইসরাইলের ভূখণ্ডের ভেতরে হামাসের এ হামলায় এক হাজারেরও বেশি ইসরাইলি সৈন্য ও সাধারণ মানুষ নিহত হয়। এ আক্রমণের জবাব দিতে গিয়ে ইসরাইল ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে অবিরাম ও ভয়ংকর যুদ্ধ পরিচালনা করছে, বিশেষ করে গাজার ভেতরে, যে অঞ্চলটিকে বলা হয় বিশ্বের সবচেয়ে বড় উন্মুক্ত জেলখানা, যে অল্প জায়গার ভেতরে প্রায় ২৩ লাখ ফিলিস্তিনি অত্যন্ত বিপন্ন পরিস্থিতিতে বসবাস করছে, সেখানে ইসরাইল পালটা হামলা চালাচ্ছে।

হামাসের মতো একটি স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠনকে পরাজিত করার জন্য ইতিহাসের নির্মমতম, নিষ্ঠুরতম ও ভয়ংকর যুদ্ধ পরিচালনা করছে ইসরাইল এবং এর ফলে ইতোমধ্যে প্রায় ২২ হাজার ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যা অবিশ্বাস্য, যার নজির সাম্প্রতিক কোনো যুদ্ধে আমরা দেখিনি। এ সংখ্যাটি যদি চলমান ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রে আমরা বিবেচনা করি, তাহলে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে কয়েক সপ্তাহের যুদ্ধে যে সংখ্যক নারী ও শিশু হত্যা করা হয়েছে, তা দুবছরব্যাপী চলমান ইউক্রেন যুদ্ধের চেয়েও অনেক বেশি। অথচ ইসরাইলের ভয়াবহ আক্রমণ বন্ধ করার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ আমরা দেখতে পাচ্ছি না।

ইতোমধ্যে গাজায় যে ধরনের নিষ্ঠুরতা, বর্বরতা প্রয়োগ করা হয়েছে, তাকে বিশ্বের অনেক দেশই যুদ্ধাপরাধ হিসাবে অভিহিত করছে। তারপরও এ আক্রমণ হয়তো সহসাই বন্ধ হবে না এবং এটি মানবজাতির জন্য, বিশ্ব বিবেকের জন্য, এবং বিশ্বসভ্যতার জন্য একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসাবেই বিবেচিত হবে। তবে এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বিশ্বব্যাপী ইসরাইলের এ নির্মমতার বিরুদ্ধে বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্বের সাধারণ জনগণের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যাচ্ছে। এককভাবে শক্তি প্রয়োগ করে একটি অসহায়, নিরীহ গোষ্ঠীকে হত্যা করা, একটি নির্দিষ্ট গ্রুপের কর্মকাণ্ডের জন্য পুরো ফিলিস্তিনিদের ওপর আক্রমণ চালানোর বিষয়টি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ নীতির বিরুদ্ধে তাদের দেশের সাধারণ মানুষও প্রতিবাদ করছে, যা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক।

বিশ্ব রাজনীতির এ দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার বাইরেও আমরা দেখেছি একদিকে যেমন দ্বিপাক্ষিক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়েছে, অন্যদিকে বহুপাক্ষিক ফোরামেও নানা বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীন ও ভারতের পৃথক পৃথক শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। দুটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের কথা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, যা কূটনীতি বা রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর একটি হচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলন। গ্লোবাল সাউথ অর্থাৎ বিশ্বের দক্ষিণের শক্তিশালী দেশগুলো-ভারত, চীন, রাশিয়া, ব্রাজিল এবং দক্ষিণ আফ্রিকার সমন্বয়ে গঠিত এ গ্রুপটি ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছিল, যখন এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি পশ্চিমা বিশ্বের প্রভাবকে অনেকটা দুর্বল করে দেওয়ারই একটি প্রক্রিয়া ছিল। শুরুতে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা না হলেও গত কয়েক বছর ধরে বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে ব্রিকসের গুরুত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যে কারণে ২০২৩ সালে ব্রিকস সম্মেলনের ফলাফলের দিকে অনেকেই তাকিয়ে ছিল। সম্মেলনে বাংলাদেশও অংশগ্রহণ করেছিল। এ সম্মেলনে ব্রিকসের সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ২০২৪ সালে ব্রিকস আরও ছয়টি দেশ নিয়ে এগারোটি দেশের একটি সংস্থা হিসাবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে। ব্রিকসের মাধ্যমে চলমান বিশ্বের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান, বিশেষ করে মুদ্রা হিসাবে ডলারের আধিপত্য হ্রাস করা, বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের একক প্রভাব হ্রাস করে বিকল্প ঋণব্যবস্থা চালু করার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। পাশাপাশি ব্রিকস বিশ্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ ডিপ্লোমেটিক প্লাটফর্ম হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে।

আরেকটি বহুপাক্ষিক গ্রুপ হচ্ছে জি-২০, ব্রিকস ও জি-সেভেনের দেশগুলোও যার সদস্যভুক্ত। এই জি-২০-এর শীর্ষ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছে ভারতে। এ শীর্ষ বৈঠকের মূল প্রতিপাদ্যটি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেটি ছিল-এক পরিবার, এক বিশ্ব, এক ভবিষ্যৎ; অর্থাৎ পুরো পৃথিবীর ভবিষ্যৎ একসূত্রে গাঁথা। এটিকে অনেকটা নাটকীয়ভাবেই সব পক্ষ অর্থাৎ জি-২০ভুক্ত রাষ্ট্রগুলো ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন সমর্থন করেছে। ফলে জি-২০ একটি একক ও অভিন্ন ঘোষণায় স্বাক্ষর করতে পেরেছে; অর্থাৎ চীন ও রাশিয়ার উপস্থিতিতেই একটি একক যৌথ ঘোষণা স্বাক্ষর করা হয়েছে, যার মাধ্যমে বিশ্ব কূটনীতিতে একটি নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। জি-২০ সম্মেলনে বর্তমান বিশ্বে উন্নয়নের ক্ষেত্রে পরিবেশ ও জলবায়ুর যে প্রভাব ও গুরুত্ব, সেটির ওপর বিশেষভাবে জোর দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়টি মাথায় রেখে বর্তমান বিশ্বের নিরাপত্তা এবং বিভিন্ন হুমকির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বলা যায়, নতুন ধরনের একটি রোড ম্যাপ জি-২০ বৈঠকে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, যদিও এটি মেনে চলার দায়িত্ব যাদের, তারাই তা সেভাবে প্রতিপালন করবে বলে মনে হয় না। কারণ দিনশেষে আমরা লক্ষ করি, এ দেশগুলো তাদের জাতীয় স্বার্থের কারণে বিভিন্নমুখী অবস্থান গ্রহণ করে এবং বিশ্ব রাজনীতিতে ক্রমাগত অনেক ঘটনার জন্ম হয়, যা বিশ্বশান্তি বা সমৃদ্ধির জন্য সহায়ক হয় না।

২০২৩ সালে জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত শীর্ষ বৈঠক কপ-২৮ অনুষ্ঠিত হয়েছে দুবাইয়ে। সেখানে জলবায়ু সমস্যা এবং জলবায়ুসংক্রান্ত তহবিল তৈরি করা এবং এ ব্যাপারে ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি তহবিলের যে ঘোষণা ছিল, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তাছাড়া তাপমাত্রা কমিয়ে আনার বিষয়েও কথা হয়েছে। লস অ্যান্ড ড্যামেজের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয়, জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়ংকর প্রভাব প্রতিটি দেশ অনুভব করছে এবং সেটি তারা স্বীকারও করছে। কিন্তু যখনই একসঙ্গে কথা বলছে, তখন এমন কোনো অবস্থান তৈরি করছে না, যে অবস্থান থেকে একটি কার্যকর পন্থা বের করে তা বাস্তবায়ন করবে। দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে, উন্নয়নশীল বিশ্ব বা দরিদ্র রাষ্ট্রগুলো, যারা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এবং যাদের সে ধরনের আর্থিক সামর্থ্য নেই, সেই দেশগুলোকে সহায়তা করা হচ্ছে না সঠিকভাবে। শত শত বছর ঔপনিবেশিক শাসনের জাঁতাকলে নিষ্পেষিত হয়েছে যে দেশগুলো, সেই দেশগুলোকে সহায়তা করার কার্যকর উদ্যোগ আমরা দেখতে পাচ্ছি না। এসব দেশের কোটি কোটি মানুষ প্রতিনিয়ত জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা করছে।

২০২৩ সালে বিশ্ব রাজনীতির মূলধারার বিষয়টি যদি আমরা বিবেচনা করি, তাহলে দেখা যায়, বিশ্ব রাজনীতিতে স্নায়ুযুদ্ধের মতো একটি পরিবেশ সৃষ্টির প্রবণতা বাড়ছে। বড় শক্তিগুলোর মধ্যে কৌশলগত প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যতই শীর্ষ বৈঠক বা আলোচনা হোক না কেন, দেশ দুটির মধ্যে বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের লড়াই বজায় থেকেছে এবং সেটি সামনে চলে এসেছে। ফলে বলা যায়, ২০২৩ সালে বিশ্ব রাজনীতিতে ভূরাজনীতি, যুদ্ধ এবং সামরিক ও নিরাপত্তার বিষয়গুলোই প্রাধান্য পেয়েছে, যদিও বিশ্ব অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা করা হয়েছে এবং কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তনও এসেছে। কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতির সমস্যাগুলো সমষ্টিগত বা যৌথভাবে সমাধানের কোনো কার্যকর চেষ্টা আমরা দেখিনি। বিশ্ব রাজনীতির ডামাডোলের ভেতরে বিশ্ব অর্থনীতি, বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক সমস্যাগুলো যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি; বরং এক্ষেত্রে কোনো কোনো দেশ একক আধিপত্য কিংবা দ্বিপাক্ষিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আঞ্চলিক প্রক্রিয়াগুলো চালু রেখে সেটি করা হয়েছে।

বিশ্ব পরিস্থিতি বিবেচনা করলে ২০২৩ সালে কতগুলো মানবিক সংকট সামনে আসে। রোহিঙ্গা সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি। ফিলিস্তিন সমস্যারও কোনো সমাধান হয়নি এবং এটি আরও কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে। ২০২৩ সালে আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশে সামরিক অভ্যুত্থান হয়েছে। সেখানে গৃহযুদ্ধের পরিবেশ তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে সুদানে। তাইওয়ান সংকট, দক্ষিণ চীন সাগর সংকট চলমান রয়েছে। বিশ্বে শরণার্থী তথা বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২৩ সালে বিশ্বে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা আরও বেশি প্রতিকূল হয়েছে, যা মানুষের জন্য আরও বৈরী পরিবেশ তৈরি করেছে। এটি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নেতৃত্বের সংকটকেই প্রতিফলিত করে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বহুপাক্ষিক কূটনীতির কার্যকর প্রভাব তেমন দেখা যায়নি। অনেক শীর্ষ বৈঠক, সম্মেলন হলেও এর চূড়ান্ত যে প্রভাব সেটি বিশ্ব শান্তি বা সমৃদ্ধির জন্য ততটা সহায়ক ভূমিকা পালন করেনি।

২০২৩ সালের বিশ্বে অনেকটা ২০২২ সালের বিশ্বেরই প্রতিফলন দেখা যায়। অধিকাংশ ঘটনার ধারাবাহিকতা ২০২৪-এও আমরা দেখতে পাবো। এসব ঘটনা বৈশ্বিক সংকট ও অনিশ্চয়তার দিকটিরই ইঙ্গিত করে এবং স্নায়ুযুদ্ধের মতো একটি পরিবেশেরও ইঙ্গিত দেয়, যা বিশ্বকে ভূরাজনীতির কঠিন লড়াইয়ের দিকে ধাবিত করছে। তাই বলা যায়, বিশ্ব রাজনীতি এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে ২০২৩ সাল বড় ধরনের কোনো গুণগত পরিবর্তন আনতে পারেনি, বরং বিশ্বকে একটি অনিশ্চয়তার পথেই নিয়ে গেছে। এর মধ্যে গাজা যুদ্ধ ও ইউক্রেন যুদ্ধকে মানবতার জন্য বড় ধরনের হুমকি হিসাবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

– ড. দেলোয়ার হোসেন: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; প্রেষণে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সদস্য হিসেবে নিয়োজিত।

দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত [লিংক]