Myanmar: This Particular Circumstance Has Never Occurred Before

189

১৯৪৯ সালের ৩১ জানুয়ারিতে শুরু হওয়া ক্যারেন ন্যাশনাল ইউনিয়নের বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে মিয়ানমারে সংঘাত শুরু হয়। মে, ১৯৪৯ সালে ১১২ দিন যুদ্ধ শেষে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ক্যারেন ন্যাশনাল ডিফেন্স অর্গানাইজেশনকে হারিয়ে ইয়াঙ্গুন শহরের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে। এ যুদ্ধ ছিল ক্যারেন এবং ভামারদের মধ্যকার সুযোগ-সুবিধার সমতা আনার জন্য ক্যারেনদের সংগ্রাম, তারা তাদের এ যুদ্ধ এখনো চালিয়ে যাচ্ছে। ১৯৯০-এর দশকে কাচীন, কায়াহ, মন এবং শান প্রদেশে সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়; কিন্তু সেই সময়েও আর ও ২০টি নতুন সশস্ত্র জাতিসত্তার দল আত্মপ্রকাশ করে। নব্বইয়ের দশক থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি চলাকালেও এ দলগুলো তাদের সংগ্রাম চালিয়ে যায়। মিয়ানমারের সামরিক সরকার পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং চলমান সংঘাতের মধ্যে জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর (ইএও) সঙ্গে শান্তি স্থাপনের জন্য আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিল। ১৫ অক্টোবর সামরিক সরকার বহুপক্ষীয় যুদ্ধবিরতি চুক্তি (এনসিএ) সইর অষ্টম বার্ষিকী উপলক্ষে জাতিগত বিদ্রোহী গোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানায়। ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি, নির্বাচিত সরকারের কাছ থেকে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখল করার পর এ অনুষ্ঠানটি ছিল সামরিক সরকার এবং জাতিগত সংখ্যালঘু নেতাদের সঙ্গে প্রথম এই ধরনের আনুষ্ঠানিক সমাবেশ।

বর্তমান সেনাসমর্থিত শাসনের বিরোধিতাকারী কারেন ন্যাশনাল ইউনিয়ন, চীন ন্যাশনাল ফ্রন্ট এবং অল মিয়ানমার স্টুডেন্টস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট। এই তিনটি সইকারী দল এ অনুষ্ঠানটি বয়কট করে। এক যৌথ বিবৃতিতে তারা জানায়, সরকার চলমান সহিংসতা বন্ধ না করা পর্যন্ত তারা এনসিএ শান্তি আলোচনায় যোগ দেবে না। এ তিনটি দল গণতন্ত্রপন্থি পিপলস ডিফেন্স ফোর্সের (পিডিএফ) সঙ্গে জোট করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই প্রায় ৭০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মিয়ানমার অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র সংঘাতের শিকার এবং তা এখনো চলমান। ২০১৫ সালের অক্টোবরে আটটি জাতিগত সশস্ত্রগোষ্ঠী এনসিএ সই করে, পরে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আরও দুটি জাতিগত বিদ্রোহী গোষ্ঠী অং সান সু চির সরকারের অধীনে যুদ্ধবিরতিতে যোগ দেয়ায় মোট ১০টি জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী এ চুক্তিতে সই করে। মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী বিদ্রোহের অবসানের একটি পদক্ষেপ হিসেবে এই চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল। সামরিক সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ২০২২ সালের মে থেকে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১০টি ইএওর সঙ্গে তিন দফা শান্তি সংলাপ আহ্বান করে এবং এ শান্তি আলোচনার ফলে চারটি সাধারণ চুক্তি হয়। এ প্রক্রিয়ায় ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ১২১টি শান্তি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

২০২৩ সালের অক্টোবরের শেষভাগে জাতিগত সংখ্যালঘু তিনটি গোষ্ঠীর সশস্ত্র সংগঠন মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স আর্মি (এমএনডিএএ), তাং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (টিএনএলএ) এবং আরাকান আর্মি (এএ) একত্রে ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স নামে জোট গঠন করে জান্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে সমন্বিত হামলা শুরু করে। ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স যৌথ অভিযান চালিয়ে চীন-মিয়ানমার বাণিজ্য কেন্দ্র বলে পরিচিত সীমান্তবর্তী চীন শওয়ে হাও শহর দখল করে নেয়। ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স চীনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথ বন্ধ করে দেয় এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত ক্রসিং দখল করে। নভেম্বরে ২০২২ থেকে চলমান অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে এএ রাখাইনের তিনটি জনপদের পাঁচটি স্থানে হামলা চালায়। ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের সদস্য এএ রাখাইনের রাথেডাং এবং মিনবিয়ার মাঝামাঝি অঞ্চলে সামরিক বাহিনীর কয়েকটি চৌকি দখল করে। এএর হামলায় জান্তা বাহিনী ও পুলিশ ৪০টি অবস্থান হারিয়েছে। ভারতের সীমান্তবর্তী মিয়ানমারের চীন রাজ্যে বিদ্রোহীরা দুটি সামরিক শিবিরে হামলা চালিয়েছে। চীন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (সিএনএফ) জান্তার নিয়ন্ত্রণে থাকা ভারতীয় সীমান্ত শহর দখলের পর ১২ নভেম্বর ফালাম টাউনশিপের ভারতীয় সীমান্ত শহর রেহ খাও দাহ শহর দখল করে, এটি উত্তর চীন রাজ্যে ভারতের প্রধান বাণিজ্য রুটে অবস্থিত। ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স থাই সীমান্তের কাছে পূর্ব কায়াহ রাজ্যের রাজধানীর অদূরে সেনাবাহিনীর সঙ্গে লড়াই করছে। ৩ নভেম্বর, পিডিএফসহ একটি প্রতিরোধ জোট সাগাইং অঞ্চলের কাওলিন শহর দখল করে, ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের আক্রমণে ৭ নভেম্বর সাগাইংয়ের তামু জেলার কাম্পাটের পতন ঘটে। কায়াহ (কারেনি) রাজ্যে, কারেনি প্রতিরোধ বাহিনী লোইকাও নিয়ন্ত্রণের জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে এবং সেখানে তারা জান্তার প্রায় ৯টি অবস্থান দখল করে।

মিয়ানমার সেনাবাহিনী দশকের পর দশক ধরে ইএওদের সঙ্গে সংগ্রাম করে আসছিল। এবারের মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি তারা কখনো হয়নি। চলমান সেনা শাসনের শুরু থেকে মিয়ানমারের ওপর পশ্চিমা চাপ অব্যাহত রয়েছে। চীন, রাশিয়া ও ভারত মিয়ানমারকে নানাভাবে সমর্থন দিলেও এ পরিস্থিতি তাদের বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলেছে। মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন জনজীবনের ওপর প্রভাব ফেলায় সরকারের প্রতি তাদের সমর্থন কমে গেছে। অনেক বিশ্লেষক অপারেশন ১০২৭-এর সাফল্যের জন্য চীনের সমর্থন আছে বলে মনে করে, অনেকের মতে মিয়ানমার এক্টের কিছুটা প্রভাব এই সমন্বিত আক্রমণের সুযোগ করে দিয়েছে। তবে যাই হোক না কেন, এবারের সংগ্রামে মিয়ানমারের গণতান্ত্রিকমনা জনগোষ্ঠী বিশেষভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভামার জনগোষ্ঠীর সমর্থন ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের সামর্থ্য বাড়িয়েছে। দেশের মূল জনগোষ্ঠী ভামারদের সেনাবাহিনীর প্রতি সমর্থন কমে যাওয়া এবং ভামার সংখ্যাগরিষ্ঠ সামরিক বাহিনীতে ভামার তরুণদের যোগদানে অনিচ্ছা এই পরিস্থিতির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। তরুণ ভামার যুবকদের কাছে বহু বছর ধরে চলা সেনাশাসনের অবসান ও গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার কিছুটা আশার আলো দেখিয়েছিল। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেটা নিভে গেলে তারা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে এবং অনেকে সশস্ত্র সংগ্রামে যোগ দেয়।

মিয়ানমারে বহু দশক ধরে সেনাবাহিনীর প্রতি বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সমর্থন সেনাবাহিনীর মনোবল ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে আসছিল। বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মধ্যে বিভক্তি ও সেনাবাহিনীর প্রতি একতরফা সমর্থন হ্রাসের কারণে অনেক সাধারণ মানুষও সেনাবাহিনীর প্রতি তাদের সমর্থন থেকে সরে এসেছে। মিয়ানমারের সব ভিক্ষু সেনাশাসন সমর্থন করে না। এখন বৌদ্ধ মঠগুলোতে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সময় অনেক মানুষ জড়ো হয় এবং সেখান থেকে অনেকে সশস্ত্র প্রতিরোধ গোষ্ঠীতে যোগ দেয়। অনেক নেতৃস্থানীয় ভিক্ষু মনে করেন, ভিক্ষুরা উগ্র-জাতীয়তাবাদ ও ঘৃণা না ছড়িয়ে রাখাইনের উন্নয়নের জন্য সক্রিয় হলে জনগণের জীবনমানের উন্নতি হতো ও দেশে শান্তি বিরাজ করত। চলমান প্রেক্ষাপটে ভিক্ষুরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করছে, তাদের নিজস্ব অহিংস প্রতিরোধ গড়ে তুলছে এবং মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী জঙ্গলে ছাত্রদের সঙ্গে অল মিয়ানমার ইয়াং মঙ্কস ইউনিয়ন নামে সংগঠিত হয়ে প্রতিরোধে অংশ নিচ্ছে।

এতদিন সেনাবাহিনীর সঙ্গে সংগ্রামরত দলগুলোর মধ্যে মতের মিল, আস্থা ও ঐক্যের অভাব থাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সম্মিলিতভাবে কিছু করতে পারেনি। বর্তমানে তারা অনেক ফ্রন্টে সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করছে। চলমান সশস্ত্র প্রতিরোধের ব্যাপক বিস্তৃতমাত্রা মিয়ানমারের সামরিক শাসকদের মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। সেনাবাহিনী নিম্ন মনোবল ও নিয়োগ জটিলতায় ভুগছে বলে জানা গেছে। সাম্প্রতিক যুদ্ধগুলোতে পুরো ইউনিট আত্মসমর্পণ বা পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সম্প্রতি বিভিন্ন অঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সমন্বিতভাবে সেনাবাহিনীর অবস্থানে একযোগে হামলা শুরু করায় তাদের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। মিয়ানমারের ইতিহাসে আঞ্চলিক গেরিলা গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে এ রকম সমন্বয় এই প্রথম। সমন্বিত এই আক্রমণে সেনাবাহিনী স্থলযুদ্ধে সুবিধা করতে না পেরে বিমান হামলা বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে হতাহতের ঘটনা বেড়েই যাচ্ছে এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। মিডিয়ার মাধ্যমে তা বহির্বিশ্বে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় জান্তা সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপও বেড়ে যাচ্ছে।

বিদ্রোহীদের হাতে একের পর এক অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে মিয়ামনারের রাজধানী নেপিদোর নিরাপত্তা রক্ষায় ১৪ হাজার সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা করেছে। দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে এখানে সেনা সদস্যদের আনতে হবে, ফলে বিদ্রোহীদের সঙ্গে সংঘর্ষরত সেনাবাহিনীর জনবলের ওপর চাপ পড়বে। প্রায় ২ বছর ধরে দেশব্যাপী চলমান সহিংসতার কারণে সেনাবাহিনীতে হতাহতের সংখ্যা বাড়তে থাকে। এর বিপরীতে সময় মতো সেনাবাহিনীর সদস্য নিয়োগ দিতে না পারা, কোটা পুরনে ব্যর্থতা সেনাবাহিনীর সামর্থ্যের প্রভাব ফেলেছে।

মিয়ানমারের চলমান সংঘাতের মধ্যে চীনের নৌবাহিনীর তিনটি জাহাজ মিয়ানমারের নৌবাহিনীর সঙ্গে যৌথ মহড়ার জন্য ইয়াঙ্গুনের থিলাওয়া বন্দরে পৌঁছেছে। এতে চীনের নৌবাহিনীর টাস্কফোর্সের প্রায় ৭০০ নাবিক এসে পৌঁছায়। এর আগে মিয়ানমার ও রাশিয়ার সামরিক বাহিনী আন্দামান সাগরে তিন দিনের যৌথ সামরিক মহড়া পরিচালনা করে। মিয়ানমারের দক্ষিণাঞ্চলীয় তানিনথারি অঞ্চলের মেইক টাউনশিপের কাছে পরিচালিত এই মহড়ায় রাশিয়ার তিনটি ডেস্ট্রয়ার ও ৮০০ নাবিক অংশ নেন। মিয়ানমারের পরিস্থিতি যতই খারাপ হোক না কেন, চীন ও রাশিয়া এই উপস্থিতির মাধ্যমে তাদের সমর্থন জানান দিয়েছে এবং এর পাশাপাশি বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরে তাদের নৌবাহিনীর উপস্থিতি এ অঞ্চলের প্রতি আগ্রহের বিষয়টিও স্পষ্ট করেছে।

বহু দশক ধরে সশস্ত্র দলগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে এখনো চীন ও রাশিয়া সমর্থন করে যাচ্ছে। চলমান পরিস্থিতিতে তারা দ্রুত সক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে, এটা ভাবা কখনোই ঠিক হবে না। মিয়ানমার সেনাবাহিনী তাদের রণকৌশলে পরিবর্তন এনে বর্তমান সমস্যা থেকে উত্তরণের চেষ্টায় সর্বশক্তি নিয়োগ করবে- এটাই স্বাভাবিক। চলমান পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে মিয়ানমারের সামনের দিনগুলো কেমন হবে তা নিয়ে এখনো মন্তব্য করার সময় আসেনি। তবে মিয়ানমার সেনাবাহিনী এই প্রথমবারের মতো এ ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে। তারা কীভাবে তা সামলে উঠে, এখন এটাই দেখার বিষয়।

– ব্রিঃ জেঃ (অবঃ) হাসান মোঃ শামসুদ্দীন, এনডিসি, এএফডব্লিউসি, পিএসসি, এম ফিল, মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা বিষয়ক গবেষক (সিবিজিএ)।

প্রকাশিত দৈনিক বাংলা [লিংক]