Hamas-Israel War and the Future of Palestine State

815

বিশ্ব সম্প্রদায়ের ক্রমাগত অবহেলা ও অবজ্ঞার মাঝে গাজাভিত্তিক হামাস গত ৭ অক্টোবর ইসরাইলে নজিরবিহীন হামলা চালিয়েছে। বলা হচ্ছে, হামাসের এ অতর্কিত হামলা ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় ঘটনা এবং এটিকে ইসরাইল ‘নাইন-ইলেভেন’ হামলা হিসাবে আখ্যায়িত করেছে। ভয়ংকর পালটা হামলায় ইসরাইল সমগ্র গাজাকে এক মৃত্যুপুরীতে পরিণত করেছে। হামাসের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করেছে ইসরাইল। এর ফলে গাজায় ভয়াবহ এক সংকট তৈরি হয়েছে, যা নজিরবিহীন মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। চলমান সংঘাতে শত শত নিরীহ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। বস্তুত এ সংঘাতে পুরো মধ্যপ্রাচ্যই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। তাই হামাসের হামলা এবং ইসরাইলের যুদ্ধ ঘোষণার কৌশলগত ও মানবিক প্রভাব ব্যাপক। ফিলিস্তিন ও ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপট থেকে শুরু করে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এ পরিস্থিতি নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে।

ফিলিস্তিন সংকটের পটভূমিঃ ১৯৪৮ সালে ইসরাইল নামক একটি অবৈধ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্য ও আরব অঞ্চলে চরম দুঃখ, দুর্দশা ও অশান্তি নেমে আসে। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইল অবৈধভাবে নিজেকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে ঘোষণা করে। স্থানীয় ফিলিস্তিনিদের নিজেদের বাসভূমি থেকে বিতাড়িত করে এ ঘোষণা দেওয়া হয়। সেই ঘোষণার পর থেকে আজ পর্যন্ত ইসরাইল আরব বিশ্ব ও ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে একাধিক যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বিভীষিকাময় যুদ্ধ ছিল ১৯৬৭ সালের যুদ্ধ, যেটি ইতিহাসে ‘ছয় দিনের যুদ্ধ’ হিসাবে পরিচিত। এ যুদ্ধের মাধ্যমে ইসরাইল শুধু ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডই দখল করেনি, তারা মিসরের সিনাই উপত্যকা, জর্দানের কিছু অঞ্চল এবং লেবাননের কিছু এলাকা দখল করে নেয়। ইসরাইল এমন একটি রাষ্ট্র, যারা ক্রমাগত নিরাপত্তা ও শক্তি বৃদ্ধির তৎপরতার নামে নৃশংস আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে এবং রাষ্ট্রটি জাতিসংঘের কোনো প্রস্তাবই অনুসরণ করেনি, এমনকি কখনো কখনো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধও তারা রক্ষা করেনি।

একটি যুদ্ধাবস্থার মধ্যেই আরব ও ফিলিস্তিনিরা বসবাস করে আসছে যুগের পর যুগ। ১৯৪৮, ১৯৫২, ১৯৬৭, ১৯৭৩ ও ১৯৮২ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধ হয়েছে। এসব যুদ্ধে সব সময় ইসরাইল ব্যাপক নৃশংস আচরণ করেছে। এখনো তাদের নৃশংসতা অব্যাহত আছে। তারা পশ্চিম তীর ও গাজায় দখলদারি বজায় রেখেছে। এ ধরনের একটি পরিস্থিতির মধ্যে ইন্তিফাদা অর্থাৎ ফিলিস্তিনিদের পুনর্জাগরণ আন্দোলন শুরু হয় এবং সেই আন্দোলনের একটি পর্যায়ে ১৯৯৩ সালে মার্কিন মধ্যস্থতায় ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি হয়। এক্ষেত্রে নজিরবিহীন ছাড় দিয়েছিলেন ফিলিস্তিনি মুক্তি সংস্থার (পিএলও) প্রধান ইয়াসির আরাফাত। তিনি ইসরাইল রাষ্ট্রের অস্তিত্ব মেনে নিয়েছিলেন এ শান্তিচুক্তিতে। ভূমির বিনিময়ে শান্তির ধারণা ইসরাইল মেনে নিয়ে পিএলওকে ফিলিস্তিনিদের প্রতিনিধি হিসাবে স্বীকার করে নেয়। ফলে পিএলও’র নেতৃত্বে পশ্চিম তীর ও গাজায় স্বশাসিত একটি ভূখণ্ড গঠিত হয়।

কিন্তু পরবর্তী সময়ে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু শান্তি প্রতিষ্ঠা দূরের কথা, বরং ফিলিস্তিনিদের নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টাই চালিয়ে এসেছেন সব সময়। এরকম একটি পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনিরা উপলব্ধি করে, তাদের নিজেদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন অধরাই থেকে গেল। ফিলিস্তিনিদের অত্যন্ত আবেগ ও ধর্মীয় অনুভূতির জায়গা পূর্ব জেরুজালেম, যাকে তারা তাদের রাজধানী হিসাবে পেতে চায় এবং তা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। কিন্তু নেতানিয়াহু ২০১৫ সালে গোটা জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসাবে ঘোষণা করেন। অর্থাৎ পূর্ব জেরুজালেম যে একটি আন্তর্জাতিক নগরী হিসাবে ছিল, সেটির মর্যাদা ইসরাইল লঙ্ঘন করে। শুধু তা-ই নয়, মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র আল আকসা মসজিদের ভেতরে ইসরাইলিরা বারবার প্রবেশ করে এর পবিত্রতা নষ্ট করে। স্বভাবতই এসব ঘটনা ফিলিস্তিনিদের হতাশা ও ক্ষোভ বাড়িয়ে দেয়।

গত বিশ বছরে গাজায় ইসরাইল বারবার হামলা চালিয়েছে এবং সেখানে একাধিক যুদ্ধ হয়েছে। ২০০৬ সাল থেকে গাজা একটি অবরুদ্ধ শহর। ইসরাইল গাজা অঞ্চলের নৌপথ, আকাশপথ সবদিক থেকেই অবরোধ করে রেখেছে। এরকম একটি কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ফিলিস্তিনিরা সময় অতিবাহিত করছে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে যখন ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয় সেই যুদ্ধের কারণে বলা যায় পৃথিবীর নজর আরও বেশি ইউরোপ ও ইউক্রেন যুদ্ধকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। ফিলিস্তিনিদের দুঃখ, নিপীড়ন ও নির্যাতনের বিষয়ে জাতিসংঘ কিংবা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কোনো ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। কয়েক বছর ধরে বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা, স্নায়ুযুদ্ধ, ইউক্রেন যুদ্ধ, তাইওয়ান সংকট-এ বিষয়গুলোই গুরুত্ব পাচ্ছে।

এ পটভূমিতে হামাস এ বড় হামলাটি চালিয়েছে। বস্তুত হামাস একটি শক্তিশালী সংগঠন এবং তাদের সামরিক উইং যেমন আছে, তেমনই রাজনৈতিক উইংও আছে। গাজাকে ইসরাইল অবরুদ্ধ করে রাখার একটি কারণ-তারা জানে হামাস সামরিক দিক থেকে অত্যন্ত শক্তিশালী। তারপরও আমরা দেখেছি হামাস ইসরাইলের আক্রমণের বিরুদ্ধে তেমন সুবিধা করতে পারেনি অতীতে। অনেক ছোট ছোট ঘটনা থেকে যে যুদ্ধ হয়েছে, সেখানে ইসরাইলের বোমা বর্ষণ এবং ব্যাপক হামলার মুখে অসংখ্য নিরীহ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। গাজায় অবর্ণনীয় দুর্দশার মধ্যে ফিলিস্তিনিরা বসবাস করছে। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতি অঞ্চলগুলোর একটি হচ্ছে গাজা। ছোট এ ভূখণ্ডে ২১ লাখ মানুষ বসবাস করে। গাজাকে পৃথিবীর একটি খোলা কারাগার বলা হয়, যেখানে ফিলিস্তিনিরা সীমাহীন দুর্ভোগের মধ্যে বসবাস করে আসছে। সেখানে জাতিসংঘের আটটি শরণার্থী শিবির আছে, যেখানে ফিলিস্তিনিরা বসবাস করে।

হামাসের এ হামলা নিয়ে সারা বিশ্বে ব্যাপক আলোচনা, তোলপাড় হচ্ছে। ইসরাইল একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র, যাদের মোসাদের মতো অত্যন্ত চৌকশ গোয়েন্দা বাহিনী আছে। দেশটির সামরিক শক্তি ব্যাপক এবং সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা পেয়ে আসছে। বলা যায়, প্রায় ৭৫ বছর ধরে ইসরাইল ক্রমাগত শক্তিশালী হয়েছে এবং ফিলিস্তিনিরা দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তির বিবেচনায় গাজাকে একটি বিপন্ন শহর হিসাবেই মনে করা হয়। সেখান থেকে মাত্র বিশ মিনিটে কীভাবে পাঁচ হাজার রকেট নিক্ষেপ করা হলো এবং কীভাবে শত শত হামাস যোদ্ধা ইসরাইলের সীমান্তের ভেতর ঢুকে পড়ল এবং ব্যাপক আক্রমণ চালাতে পারল, সেটি একটি বিস্ময়ের ব্যাপার। ইতোমধ্যে ইসরাইলের পালটা হামলায় গাজা এখন আরও অবরুদ্ধ, আক্রান্ত একটি শহর। সেখানে শত শত ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হচ্ছে। একই পরিবারের ১৭ জনসহ ব্যাপক গণহত্যার ঘটনা ঘটেছে। ইসরাইলের সমর্থনে মার্কিন রণতরী এগিয়ে আসছে।

হামাস একটি স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র এ যুদ্ধের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়। ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের প্রধান মাহমুদ আব্বাস শান্তি প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির চেষ্টার ক্ষেত্রে যে ব্যাপক অবহেলা ও উদাসীনতা আমরা লক্ষ করেছি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মাঝে, সেই অবহেলার শিকার হয়েই বলা যায় হামাস এ হামলা চালিয়েছে। হামাসের আক্রমণের পেছনে যে কারণগুলোর কথা বলা হয়ে থাকে, যা আলজাজিরা থেকে শুরু করে বিভিন্ন গণমাধ্যমে এসেছে তা হচ্ছে-হামাসের সামরিক অভিযানের উদ্দেশ্য হচ্ছে আল আকসা মসজিদের পবিত্রতা রক্ষা করা। একই সঙ্গে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগেই সৌদি আরবসহ গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে ইসরাইলের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল, যা হামাসের মধ্যে একটি বড় ধরনের হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি করেছে। তারা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জন্য একটি বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এ হামলাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই এবং হামলার মাত্রায় তারতম্য থাকলেও এ সশস্ত্র সংঘাত ১৯৪৮ সাল থেকেই সংঘটিত হয়ে আসছে। সংঘাত দূর করার জন্য ইয়াসির আরাফাত যে ঐতিহাসিক ছাড় দিয়েছিলেন, তার প্রতিদান হিসাবে যে প্রতিশ্রুতি ১৯৯৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র করেছিল, তা রক্ষা করা হয়নি। দুই রাষ্ট্রকেন্দ্রিক সমাধানের অনুপস্থিতির কারণেই এ যুদ্ধ ও সংঘাত যেমন অতীতে ছিল, তেমনই বর্তমানেও দেখা যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হয়তো তা চলমান থাকবে।

আমরা লক্ষ্য করেছি-তুরস্ক, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, বাংলাদেশসহ সব রাষ্ট্রই ফিলিস্তিনি সমস্যার একটি দ্বি-রাষ্ট্রকেন্দ্রিক সমাধানের কথা বলেছে, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতেও এটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ইউরোপের প্রায় সব দেশই দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের কথা বলে আসছে। কিন্তু তা বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না।

ইসরাইলে হামাসের এ হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি এখন নতুনভাবে প্রভাবিত হবে। একই সঙ্গে বর্তমান বিশ্বে চলমান ইউক্রেন যুদ্ধ এবং অন্য যে সংকটগুলো আছে তার ওপরও এর একটি প্রভাব পড়বে। হামাসের এ হামলা ও পরবর্তী ঘটনাগুলো একটি নতুন ধরনের বাস্তবতা তৈরি করবে নিঃসন্দেহে। সেই বাস্তবতায় বৃহৎ শক্তিগুলো কতটা দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে, তা গুরুত্বপূর্ণ। ইসরাইল তার নিরাপত্তার নামে কতটা আগ্রাসী হবে, কতটা শক্তিশালী হবে-এ বিষয়গুলোর মীমাংসা করা অত্যন্ত জরুরি। ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের যে সম্ভাবনা, সেটিকে ধীরে ধীরে অবাস্তব করে দেওয়া কতটা ভয়ংকর ও নির্মম হতে পারে, তা ভাবতে হবে। এসব বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও পশ্চিমা বিশ্বের এগিয়ে আসার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এখন এটি আরও বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে। ফিলিস্তিনি জনগণের মুক্তি ও স্বাধীন ফিলিস্তিন প্রতিষ্ঠা ছাড়া এ যুদ্ধ ও সংঘাতের অবসান ঘটবে না। এ ক্ষেত্রে দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানই একমাত্র পথ। যুদ্ধ ও সংঘাতের পথ পরিহার করে শান্তি আলোচনা শুরু করতে হবে। অবিলম্বে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার প্রকৃত কাজটি কেবল তখনই শুরু হবে।

– ড. দেলোয়ার হোসেন: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; প্রেষণে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সদস্য হিসেবে নিয়োজিত।

দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত [লিংক]