Will These Actions Yield Any Positive Outcomes?

289

জাতিসংঘ এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীনের উদ্যোগে মিয়ানমারের নেওয়া পাইলট প্রকল্পের বিরোধিতা করে মিয়ানমারের চলমান পরিস্থিতিতে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরুর বিরুদ্ধে তাদের মত ব্যক্ত করেছে। তারা মনে করে, মিয়ানমারের পরিবেশ এখনো প্রত্যাবাসনের জন্য অনুকূল নয়। পাইলট প্রকল্পের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা না গেলেও এর পরপরই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিভিন্ন দাতা দেশ ও সংস্থার প্রতিনিধিরা পরিদর্শনে আসে। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর চালানো নির্যাতন-নিপীড়নের তথ্যানুসন্ধানে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রধান কৌঁসুলি করিম আসাদ আহমাদ খান ৬ জুলাই আইসিসির ১০ সদস্যের প্রতিনিধি দল নিয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন। ক্যাম্প পরিদর্শনের সময় তারা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের কাছ থেকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অত্যাচার, নৃশংসতা, তাদের পালিয়ে আসার পরিস্থিতি এবং রোহিঙ্গা নারীদের ওপর সেনাবাহিনীর বর্বরতার বিষয়ে অবহিত হন। আইসিসি রোহিঙ্গা জেনোসাইডে জড়িত মিয়ানমারের সেনাসদস্যদের বিচার ও জবাবদিহির আওতায় আনার জন্য এসব তথ্য সংগ্রহ করছে। আইসিসির প্রধান কৌঁসুলি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পরিস্থিতি, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা ও তাদের সহায়তা নিয়ে আলোচনা করেন এবং খাদ্য সহায়তা কমিয়ে দেওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এর ফলে ক্যাম্পের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পাশাপাশি নারী ও শিশুদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে তিনি তার মতপ্রকাশ করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের বেসামরিক নিরাপত্তা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি উজরা জেয়ার নেতৃত্বে মার্কিন প্রতিনিধি দল ১২ জুলাই রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। প্রতিনিধি দলের সদস্যরা রোহিঙ্গা কমিউনিটি নেতা ও প্রতিনিধিদের সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন, প্রত্যাবাসনসহ নানা বিষয়ে মতবিনিময় করে। মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি রোহিঙ্গা প্রতিনিধিদের বক্তব্য শোনার পর নিজেদের মধ্যে সংঘাতে না জড়িয়ে প্রত্যাবাসন ও মিয়ানমারের নির্যাতনের বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিচারের জন্য ধৈর্য ধরতে তাদের প্রতি আহ্বান জানান। এ সময় রোহিঙ্গারা নিরাপদ, টেকসই ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসন কার্যক্রম শুরু করতে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ কামনা করে। মার্কিন প্রতিনিধি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও সহায়তার বিষয়ে আগের মতোই পাশে আছে জানিয়ে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় মিয়ানমার এবং বাংলাদেশের উদ্যোগগুলোর সমর্থনে আরও ৭৪০ কোটি টাকা অনুদানের ঘোষণা করে, যা মিয়ানমারে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা, তাদের আশ্রয়দানকারী জনগোষ্ঠী ও অন্যদের সহায়তার জন্য দেওয়া হবে।

বাংলাদেশের উদ্যোগে ওআইসি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পক্ষ থেকে ‘রোহিঙ্গা মুসলিম ও মিয়ানমারের অন্য সংখ্যালঘুদের মানবাধিকার পরিস্থিতি’ শীর্ষক প্রস্তাবটি জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের ৫৩তম অধিবেশনে উত্থাপন করা হয়। বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন ও এই জনগোষ্ঠীর পক্ষে ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা নিশ্চিতের মাধ্যমে চলমান সংকটটির টেকসই সমাধানের ওপর জোর দিয়ে ১৪ জুলাই জাতিসংঘে সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাবটি পাশ হয়েছে। মিয়ানমারের অস্থিতিশীল রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে প্রস্তাবটি উত্থাপনের পর থেকেই বিভিন্ন বিষয়ে জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে স্পষ্ট মতভেদ দেখা দেয়। অবশেষে দীর্ঘ আলোচনার পর প্রস্তাবটি জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। প্রস্তাবে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে সাময়িক আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রশংসার পাশাপাশি প্রত্যাবাসন নিয়ে চলমান অনিশ্চয়তার ফলে রোহিঙ্গাদের মধ্যে সৃষ্ট হতাশা এবং এর নানাবিধ নেতিবাচক প্রভাবের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। প্রস্তাবে রাখাইনে দ্রুত সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে টেকসই এবং স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসনের ওপর জোর দিয়ে ক্রমাগত কমতে থাকা এবং অপর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য আহ্বান জানানো হয়। রোহিঙ্গাদের ওপর চলা সব ধরনের নির্যাতন, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত ও দায়ী ব্যক্তিদের আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার আওতায় আনা ও তদন্ত প্রক্রিয়া জোরদার করার প্রতি গুরুত্বারোপ করে আন্তর্জাতিক আদালতে চলমান বিচার প্রক্রিয়াকেও সমর্থন জানানো হয় এ প্রস্তাবে।

২৪ জুলাই ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি ইমন গিলমোর নেতৃত্বে ৫ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফরে এসে রোহিঙ্গা ও মানবাধিকার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক ও কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করেন। এ সময় রোহিঙ্গা প্রতিনিধিরা তাদের অভাব-অভিযোগের পাশাপাশি নিরাপদ প্রত্যাবাসনে সহযোগিতার দাবি জানায়। রোহিঙ্গারা জানায়, এ জীবন তাদের আর ভালো লাগছে না, দাতা সংস্থা খাদ্য সহায়তা দিন দিন কমাচ্ছে এবং ক্যাম্পগুলোতে খুন-অপহরণ গোলাগুলি বেড়েই চলছে, তারা বিপদের মধ্যে সময় পার করছে এবং নিরাপদ প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে নিজ দেশে ফেরত যেতে চায়। ইমন গিলমোরের মতে, মিয়ানমারেই রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হতে হবে। সামরিক অভ্যুত্থানের কারণে মিয়ানমারের পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে এবং সে কারণে ইইউ মিয়ানমারের সামরিক সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়া থেকে বিরত রয়েছে এবং মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অনেক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ইইউ মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত নিয়োগ করেছে এবং আসিয়ানসহ সমমনা দেশগুলো নিয়ে মিয়ানমার সংকটের জন্য ইইউ কাজ করছে। রোহিঙ্গা সমস্যা মোকাবিলায় চলমান তহবিলের সংকট একটা বড় সমস্যা এবং তা উদ্বেগজনক বলে তিনি তার মতপ্রকাশ করেন। রোহিঙ্গাদের জন্য ইইউর সহায়তা অব্যাহত থাকবে এবং প্রয়োজনে বাড়তি তহবিলও দেওয়া হবে বলে জানানো হয়। তহবিল সংকট কাটাতে ইইউ সদস্য ও অন্যান্য দেশের সরকারের সঙ্গেও তারা কাজ করে যাবে। রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায় এবং মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিতে ইইউ জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ ও অন্যান্য ফোরামে তাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে।

২৭ জুলাই রিইন্ট্রোডিউসিং উইম্যান’স লিডারশিপ শিরোনামে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিক (এফডিএমএন) রিপ্রেজেনটেটিভ কমিটি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রচলিত প্রথা ভেঙে রোহিঙ্গা নারীদের নিয়ে সমাবেশের আয়োজন করে। এ সমাবেশে এক হাজারেরও বেশি বিভিন্ন বয়সি রোহিঙ্গা নারী প্রতিনিধি স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে। বিশ্বায়নের এ সময় নারীর ক্ষমতায়নের বিকল্প নেই এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী হওয়া সত্ত্বেও রোহিঙ্গা নারীদের প্রথা ভেঙে এ সমাবেশে আসা একটা প্রশংসনীয় এবং সাহসী পদক্ষেপ। রোহিঙ্গা নারী প্রতিনিধিরা জানায়, তারা আর আশ্রিত জীবন চায় না এবং নিজেদের দেশে ফিরে যেতে চায়। বাংলাদেশ সরকার ও ইউএনএইচসিআরের প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরে এখন মোট রোহিঙ্গার মধ্যে ৫২ শতাংশ নারী। এই প্রথমবারের মতো তারা বাড়ি ফেরা কর্মসূচিতে যুক্ত হয়েছে এবং ঐক্যবদ্ধ হলে রোহিঙ্গা নারীদের যে থামানো যাবে না তারা সেটাই প্রমাণ করেছে। রোহিঙ্গা নারীদের প্রত্যাবাসনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এ উদ্যোগে নিঃসন্দেহে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

চীন প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থেকে তাদের কার্যক্রম চলমান রেখেছে। বেশ কিছু কারণে পাইলট প্রকল্পের দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলেও সম্প্রতি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কিছুটা আশার আলো দেখা যাচ্ছে। চীনের এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত দেং শি জুন ৩০ জুলাই ঢাকা সফরে এসে প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা করেছে। এতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে এত দিনের আলোচনায় নতুন মাত্রা এসেছে। ডিসেম্বরের মধ্যে কয়েক পর্যায়ে ৭ হাজার রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন সম্পন্ন করার প্রত্যাশা নিয়ে চীন এগিয়ে যাচ্ছে। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের ক্যাম্পে ফিরে যেতে অনীহা থাকায় এবার আর ক্যাম্প বা মডেল ভিলেজে রোহিঙ্গাদের না নিয়ে তারা যেসব এলাকায় বসবাস করত, সেখানেই তাদের পুনর্বাসনে রাজি হয়েছে মিয়ানমার। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরে গেলে তাদের প্রথম তিন মাসের ব্যয় বহন করা হবে এবং জীবিকার জন্য তাদের মাছ ধরা ও কৃষি কাজের সুযোগ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে মিয়ানমার। চার মাসেরও কম সময়ের মধ্যে ঢাকায় চীনা দূতের এটি দ্বিতীয় সফর। ৩১ জুলাই পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেনের সঙ্গে বৈঠক করেন চীনা দূত। আলোচনায় পরীক্ষামূলক প্রকল্পের আওতায় ১ হাজার ১৭৬ রোহিঙ্গাকে দিয়ে প্রত্যাবাসন শুরু করার বিষয়টি অগ্রাধিকার পায়। বাংলাদেশে আসার আগে চীনের বিশেষ দূত মিয়ানমার সফর করেছেন। মিয়ানমার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে রাজি বলে চীনের দূত বাংলাদেশকে জানিয়েছে।

বর্তমানে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে পশ্চিমা দেশ ও দাতাগোষ্ঠী, চীন এবং রোহিঙ্গাদের সদিচ্ছা মিলে ত্রিমুখী কার্যক্রম চলছে, যা এ সংকট নিরসনে জরুরি। রোহিঙ্গাদের খাদ্য সহায়তা কমে যাওয়া এবং এর ফলে সংশ্লিষ্ট সমস্যা সম্পর্কে দাতাদেশ ও সংস্থাগুলো অবগত রয়েছে। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরু করতে বাংলাদেশ সরকার মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিকভাবে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বহুপাক্ষিক ফোরামেও বিষয়টা নিয়ে আলোচনা চালাচ্ছে। ফলে জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদে রোহিঙ্গা সংকট সম্পর্কিত প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে পাশ হয়েছে। আলোচনার মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান করা যাবে বলে বাংলাদেশ দৃঢ় বিশ্বাসী। অধিকাংশ রোহিঙ্গা নিজের দেশে ফিরে যেতে চায় এবং রোহিঙ্গা নারীরাও এখন প্রত্যাবাসনের জন্য সোচ্চার হয়েছে, যা আশা জাগানিয়া। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে পাইলট প্রকল্প নিয়ে চীনের ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগ বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হলেও বাংলাদেশ এ বিষয়ে সব সময় আশাবাদী। সেই সঙ্গে বাংলাদেশ আশা করে, জাতিসংঘ, দাতা দেশ ও মানবিক সাহায্য সহযোগিতা প্রদানকারী সংস্থা, রোহিঙ্গাদের স্বার্থ ও অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন এবং নারী অধিকার সুরক্ষাসংক্রান্ত ফোরাম ও সংগঠনগুলো এ প্রলম্বিত সমস্যা সমাধানে সক্রিয় ভূমিকা রেখে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করবে।

– ব্রিঃ জেঃ (অবঃ) হাসান মোঃ শামসুদ্দীন, এনডিসি, এএফডব্লিউসি, পিএসসি, এম ফিল, মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা বিষয়ক গবেষক (সিবিজিএ)।

দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত [লিংক]