Is Bangladesh Really Tilting?

498

আন্তর্জাতিক এবং দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে অনেক বিশ্লেষক বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও কূটনীতি নিয়ে বিভিন্ন ধরনের বিশ্লেষণ ও মন্তব্য করছেন। এর মধ্যে একটি আলোচিত বিষয় হচ্ছে, বিশেষ করে গণমাধ্যমে আমরা যেটি দেখতে পাচ্ছি, বাংলাদেশ চীনের দিকে অথবা কোনো একটি বিশেষ রাষ্ট্র বা ব্লকের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। বিষয়টি তলিয়ে দেখা দরকার।

আমরা জানি, বিশ্ব রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন সূচিত হয়েছে গত এক দশকে। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে; বলা যায়, অনেকটা ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্নে’ অবস্থান করছে এ দুই শক্তি। ইউক্রেনকে কেন্দ্র করে রাশিয়া ও পশ্চিমা বিশ্বের মুখোমুখি অবস্থানও বেশ গুরুত্বের দাবিদার। এ অবস্থান যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত বজায় থাকবে। তারই প্রভাব, বিশেষ করে ভূরাজনৈতিক প্রভাব পড়ছে সারা বিশ্বে। কারণ আমরা জানি, রাশিয়ার সঙ্গে চীনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। একইসঙ্গে এশিয়ার দিকে যদি আমরা তাকাই তাহলে দেখতে পাই, কোরিয়ান উপত্যকা কিংবা তাইওয়ান প্রণালি অথবা দক্ষিণ চীন সাগর, সেখানেও চীনের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সেখানকার আঞ্চলিক বিভিন্ন দেশের মতপার্থক্য রয়েছে, এমনকি বেশ অনাস্থার সম্পর্ক রয়েছে।

বস্তুত দীর্ঘদিন ধরেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে চীনের একটা দূরত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছিল। আমরা জানি, ২০১৬ সালে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দায়িত্ব গ্রহণ করেন তখন থেকেই চীনের সঙ্গে বাণিজ্য বিরোধ, এমনকি বাণিজ্য যুদ্ধ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। ফলে একদিকে চীনের সঙ্গে দূরত্ব বৃদ্ধি পাওয়া, অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থান-সবকিছু মিলে আমরা দেখতে পাচ্ছি বিশ্বরাজনীতিতে একটা ‘High Politics’ বড় ধরনের প্রভাব বিস্তার করছে। ইউক্রেন যুদ্ধ এবং এর আগে করোনা মহামারির কারণে বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ পণ্যসামগ্রীর সাপ্লাই বা সরবরাহ চেইন গত কয়েক বছর ধরেই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। খাদ্য সংকট তৈরি হয়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সারা বিশ্বেই আমরা লক্ষ করছি। ডলারের সঙ্গে অন্যান্য মুদ্রার ভারসাম্য হয়েছে টালমাটাল। এরকম এক পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই ‘হাই পলিটিক্সের’ প্রভাবে শক্তিশালী দেশগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে। তাদের ভেতরে অনাস্থা বাড়ছে, সংকট বাড়ছে।

এর একটি বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক দিক হচ্ছে, পৃথিবীর অন্যান্য রাষ্ট্রও এ বাস্তবতা দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। আমরা যদি ইউরোপ থেকে শুরু করি, তাহলে দেখব প্রায় সব দেশই তাদের স্বাধীন-সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতি ও তাদের অবস্থান নিয়ে এক ধরনের চাপের মধ্যে পড়েছে। ইউরোপের দেশগুলো, এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলো এবং আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার অনেক দেশই বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যকার এই পারস্পরিক সম্পর্কের টানাপোড়েন ও সংঘাতের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার শিকার হচ্ছে।

বিভিন্ন পর্যায়ে বাংলাদেশের অবস্থান ও পররাষ্ট্রনীতির ওপর এর প্রভাব নিয়েও নানা আলোচনা হচ্ছে, যেগুলো অনেক ক্ষেত্রেই মনে হয় এক ধরনের একপেশে কিংবা দুর্বল আলোচনা বা বিশ্লেষণ। যেমন, বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ কোনো একটি রাষ্ট্র বা পক্ষের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। অথবা এ ধরনের একটি ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। সার্বিক বিশ্লেষণে একদিকে যদি আমরা বিশ্ব প্রেক্ষাপটের দিকে তাকাই, অন্যদিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মৌলিক যে নীতি ও কৌশল অবলম্বন করে সরকার গত ১৫ বছর ধরে তার পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করছে, সেদিকে দৃষ্টিপাত করি, তাহলে স্পষ্ট হবে-এমন ধারণা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য বা এর তেমন কোনো ভিত্তি নেই। সেক্ষেত্রে স্পষ্ট করেই বলা যায়, বাংলাদেশ কোনো পক্ষের দিকে ঝুঁকে পড়ছে না। সম্ভবত বাংলাদেশই একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক শক্তি, যে দেশটির সঙ্গে বিশ্বের সব পক্ষেরই চমৎকার বোঝাপড়ার সম্পর্ক রয়েছে, ব্যাপক অর্থনৈতিক যোগাযোগ রয়েছে এবং বাংলাদেশের নেতৃত্ব সেটি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। ফলে বাংলাদেশ তার জাতীয় স্বার্থের জায়গা থেকে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করছে, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পরিচালনা করছে, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ফোরামে বক্তব্য রাখছে। এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কোনো রাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকে পড়ছে না। কিন্তু লক্ষ করা যাচ্ছে, বাংলাদেশ বিভিন্ন ঘটনায় যে ধরনের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছে অথবা যে ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে, সেই সিদ্ধান্তগুলোকে কোনো কোনো বিশ্লেষক তাদের মতো করে ব্যাখ্যা করে কোনো রাষ্ট্র বা পক্ষের দিকে বাংলাদেশ ঝুঁকে পড়ছে বলে দেখাতে চাচ্ছেন। প্রকৃতপক্ষে আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মূল যে নীতি-সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়-বাংলাদেশ সেটা অনুসরণ করেই নিজের অবস্থান নির্ধারণ করছে বলে আমি মনে করি।

বস্তুত বাংলাদেশ কোনো পক্ষভুক্ত হওয়ার অথবা নিজের পররাষ্ট্রনীতিকে ভূরাজনৈতিক অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করার কোনো চেষ্টা করছে না এবং করার কোনো সুযোগও নেই। বাংলাদেশের অবস্থান খুবই স্পষ্ট। ফলে বাংলাদেশ যখন কোনো একটি বৃহৎ শক্তির আচরণ বা ক্রিয়াকে কেন্দ্র করে বক্তব্য রাখছে অথবা কোনো অবস্থান গ্রহণ বা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছে, সেটি যদি অন্য কোনো রাষ্ট্রের অবস্থানের সঙ্গে মিলে যায়, তাহলে তা কোনোভাবেই বাংলাদেশের ঝুঁকে যাওয়ার বিষয় নয়। বরং সেটি হচ্ছে বিশ্বরাজনীতির প্রবণতা, বিশ্ব কূটনীতির বৈশিষ্ট্য। কারণ আমরা লক্ষ করি, পৃথিবীতে ১৯৩টি রাষ্ট্র জাতিসংঘের সদস্য। এ রাষ্ট্রগুলোর ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান থাকলেও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে তাদের ১৯৩টি ভিন্ন অবস্থান গ্রহণের সুযোগ নেই। বর্তমান বিশ্বে গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল বিশ্বের একটি অবস্থান আছে। সেখানে বাংলাদেশ যেভাবে ভাবছে, উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক দেশই সেভাবে ভাবতে পারে। বাংলাদেশ যেভাবে কোনো একটি বিষয়কে মোকাবিলা করার চেষ্টা করছে, তার সঙ্গে অন্য দেশের এক ধরনের সাদৃশ্য তৈরি হতে পারে। এটা সব দেশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। যখন দেখা যায় বাংলাদেশ জাতিসংঘের কোনো প্রস্তাবে নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখছে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে, সেটি রাশিয়ার পক্ষে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে আসলে বাংলাদেশ তার অবস্থান জানিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু এটিকে এই বলে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে যে, বাংলাদেশ রাশিয়ার দিকে ঝুঁকছে। আবার যখন বাংলাদেশ ইউক্রেনের কোনো একটি প্রস্তাব সমর্থন করছে, তখন সেটি পশ্চিমা বিশ্বের পক্ষে যাচ্ছে অথবা বাংলাদেশ রাশিয়া থেকে সরে যাচ্ছে বলে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।

আসলে বিষয়গুলোকে এতটা সরলভাবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র। বাংলাদেশের একটি আন্তর্জাতিক সত্তা আছে। বাংলাদেশ ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে ক্রমান্বয়ে বিশ্বে নিজের একটি অবস্থান তৈরি করেছে। কূটনৈতিক কার্যক্রম ও বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্বের মাধ্যমে গত এক দশকে তার এ অবস্থান আরও সুদৃঢ় হয়েছে। ফলে এরকম একটি অবস্থান থেকে বাংলাদেশ যখন কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে-সেটি বাংলাদেশের একান্তই নিজস্ব অবস্থান। এটি বাংলাদেশ কারও দিকে ঝুঁকে যাওয়ার পরিচয় বহন করে না। এটিকে যারা ভুলভাবে ব্যাখ্যা করছেন, তাদের কোনো স্বার্থ থাকতে পারে বা তাদের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সাম্প্রতিক ইতিহাস পর্যালোচনা কিংবা আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করলে দেখা যাবে, বিশেষ করে বর্তমান বিশ্বরাজনীতিতে যে ধরনের উত্তাপ তৈরি হয়েছে বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে, তাতে যারা বাংলাদেশের বন্ধুরাষ্ট্র তারা নিজেরাই নিজেদের মধ্যে নতুন ধরনের অস্থিতিশীল সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছে, অনাস্থার সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছে। তাদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় ১০০টিরও বেশি রাষ্ট্র, যারা উন্নয়নশীল বিশ্বের অন্তর্ভুক্ত, তারা সবাই এ ধরনের সংকটের মধ্যে আছে। কাজেই এ বিষয়টি সবাইকে অনুধাবন করতে হবে। বিশ্লেষকরা অথবা বাংলাদেশের জনগণ যদি এ পরিস্থিতিকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে না পারেন, তাহলে আন্তর্জাতিক পক্ষগুলো সেই সুযোগটি নেওয়ার চেষ্টা করবেই।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাস ও প্রবণতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ তার নিজের অবস্থানেই আছে। বাংলাদেশ তার নিজের অবস্থান থেকেই বিভিন্ন কূটনৈতিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে। এটি নিঃসন্দেহে অন্য কোনো দেশ বা জোটের সঙ্গে মিলে বাংলাদেশ করছে না। বাংলাদেশের অবস্থানের সঙ্গে যখন কোনো রাষ্ট্রের অবস্থানের সাদৃশ্য তৈরি হয়, সেটি একান্তই কাকতালীয় এবং এমনটি যে কোনো শক্তির ক্ষেত্রেই ঘটতে পারে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও হতে পারে, চীনের ক্ষেত্রেও হতে পারে, ভারতের ক্ষেত্রেও হতে পারে, জাপানের ক্ষেত্রেও হতে পারে। কাজেই আমার মনে হয়, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ থাকার অবকাশ নেই যে, বাংলাদেশ কোনো পক্ষেই ঝুঁকছে না, বরং বাংলাদেশ তার স্বাধীন ও জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে চলেছে।

– ড. দেলোয়ার হোসেন: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; প্রেষণে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সদস্য হিসেবে নিয়োজিত।

যুগান্তরে প্রকাশিত [লিংক]