Modi-Biden Summit and Bangladesh

403

২১ জুন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে পৌঁছবেন। তার এই সফরের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও দৃঢ় হতে চলেছে। দিল্লি ও ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র বাদেও এই সফরের আগ্রহের আরেকটি কেন্দ্রবিন্দু বাংলাদেশ। সংবাদমাধ্যমে জানা গেছে, এই সফরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে আলোচনায় থাকছে বাংলাদেশ। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের নিরন্তর তৎপরতা, নতুন ভিসানীতির মধ্য দিয়ে যা প্রতিফলিত। বাংলাদেশ তো বটেই, ভারতকেও তা খানিকটা অস্বস্তির মধ্যে ফেলেছে। ওই নীতির রূপায়ণ, দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে তার সম্ভাব্য প্রভাব এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন ভারতের অস্বস্তি ও চিন্তার কারণ। অস্বীকার করার উপায় নেই, অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই বৈঠকটি বিশ্বরাজনীতি এবং ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যমান বিশ্ব বাস্তবতায় ভূরাজনীতি ক্রমেই পাল্টাচ্ছে। ঘটনা প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। এই সময়ে দুই দেশের সরকারপ্রধানের মধ্যে বৈঠকের বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ নানা আঙ্গিকে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কের যে হিসাবনিকাশ ছিল তাতে একাধিক বড় পরিবর্তন দেখা গেছে। শুধু যুক্তরাষ্ট্রই নয়, গোটা পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের সমীকরণের মধ্যে পার্থক্য তখন থেকে লক্ষ্য করা যায়। আঞ্চলিক একাধিক বহুপাক্ষিক জোটের সঙ্গে ভারত যুক্ত আছে। এর মধ্যে কোয়াড উল্লেখযোগ্য। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলকে কেন্দ্র করে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে। গত এক দশকে বিশেষত গত পাঁচ বছরে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক অনেক বিস্তৃত হয়েছে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পূর্বে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে ভারতের ব্যাপক সম্পর্কের উন্নয়ন হয়েছে এবং এখন তা অত্যন্ত গভীরে পৌঁছায়। এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার পরও বৈশ্বিক রাজনীতিতে ভারতের ভূমিকায় কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। এই মুহূর্তে ভারত একটি জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করার চেষ্টা করছে। এ কারণে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে স্পষ্ট মতপার্থক্য দেখা যায়। সামরিক সহযোগিতা, তেল ও গ্যাস বাণিজ্যে ভারত-রাশিয়ার সম্পর্ক অত্যন্ত শক্তিশালী। তাই এই বৈঠকের মাধ্যমে ভারতের সঙ্গে মার্কিন মুলুকের সম্পর্ক আরও গভীর করা এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষেত্রে একাধিক বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হওয়ার আশা করা যায়। এমনকি পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে ভারতকে সংযুক্ত করার একটি চেষ্টাও হয়তো আমরা দেখব।

ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের দুই রাষ্ট্রপ্রধানের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ভারতকে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে আরও ভালোভাবে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করা হবে। আমরা দেখছি, আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু এখন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল। এই অঞ্চলে বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগর এবং ইন্দো-প্যাসিফিক বিভিন্ন অঞ্চলের ভূভাগের দিকে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে, বর্তমান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র যেমনঃ ভারত, চীন, জাপান ও আসিয়ান রাষ্ট্রগুলো এখানে অবস্থিত। গত এক দশকে চীনের বিস্ময়কর উত্থান ঘটেছে। তবে চীনের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা বিশ্বের দূরত্ব ক্রমেই বাড়ছে। বলা বাহুল্য, চীনের সঙ্গে ভারতের এক ধরনের প্রতিযোগিতা আছে এবং তাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে কিছু বিষয় রয়েছে। ফলে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের একটি ভিন্নমাত্রার গুরুত্ব তৈরি হয়েছে।

ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের কথা বলা হলে সঙ্গত কারণেই বাংলাদেশের প্রসঙ্গ চলে আসে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ইন্দো-প্যাসিফিক আউটলুক ঘোষণা করেছে। এই মুহূর্তে বাংলাদেশ এমন একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্র, যার সঙ্গে বিশ্বরাজনীতির প্রায় সব বৃহৎ শক্তির সুসম্পর্ক রয়েছে। ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ এটিই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি। জোটনিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখতে গিয়ে বাংলাদেশকে প্রায়ই নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। এই চ্যালেঞ্জ থাকার পরও বাংলাদেশ তার কূটনৈতিক পদক্ষেপ ও পরিকল্পনা যথেষ্ট সফলতার সঙ্গেই পরিচালনা করছে। প্রশ্ন হচ্ছে, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের দুই রাষ্ট্রপ্রধানের বৈঠকে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ এত গুরুত্বপূর্ণ কেন। সম্প্রতি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিংবা পশ্চিমা বিশ্বের কূটনৈতিক তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। অনেক সময় রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও এ বিষয়ে কিছু সিদ্ধান্ত পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি তাদের নতুন ভিসানীতি ঘোষণা করেছে। এর আগে বিশেষায়িত নিরাপত্তা বাহিনীর কয়েকজন সদস্যের ওপর তারা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এ ছাড়া পশ্চিমা বিশ্বের অনেক রাজনীতিক বিভিন্ন সময় বিবৃতি কিংবা মন্তব্যের মাধ্যমে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামানোর চেষ্টা করছেন। আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে বিদেশিদের মাথা ঘামানোর ফলে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি তো বটেই, আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতেও এক ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বেÑ এমন একটি আশঙ্কার কথা বলেছেন কোনো কোনো বিশ্লেষক।

আপাতদৃষ্টে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বিষয়ে বিদেশিদের চাপ দেখে মনে হতেই পারে, তাদের সঙ্গে আমাদের এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এগুলো শেষ পর্যন্ত কূটনীতিরই অংশ। বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের আগ্রহ নতুন কিছু নয়। শুধু বর্তমান সরকারই নয়, অতীতে যারা ক্ষমতায় ছিল তাদেরও এই বিষয়টি সামাল দিতে হয়েছে। তখনও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশিদের আগ্রহকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। আজ যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন, তারাই যে বিদেশিদের আগ্রহের বিষয়টিকে প্রত্যাখ্যান করছেন তা কিন্তু নয়। এই মুহূর্তে অনেক রাজনৈতিক শক্তি বৈদেশিক প্রভাবকে ব্যবহারের চেষ্টা করছেন ক্ষমতা দখলের আশায়। প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ একটি লেখায় বলেছিলাম, আমাদের রাজনীতির দুর্বলতাই বিদেশিদের নাক গলানোর সুযোগ করে দিচ্ছে। কিন্তু অতীতে যারা ক্ষমতায় ছিলেন, তারাও কিন্তু বিদেশিদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের বিষয়টি মেনে নেননি। বিদেশি শক্তির মুখোমুখি হওয়া আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ যে নেই তা কিন্তু নয়।

ভারতের কাছে এই মুহূর্তে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতাবস্থা অত্যন্ত জরুরি। প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ এবং অংশীদারত্বমূলক সম্পর্ক রয়েছে। গত কয়েক বছরে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ, জ্বালানি ও সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সাফল্য রচিত হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশই একমাত্র শক্তি, যার মধ্যে ব্যাপক খোলামেলা ও অংশীদারত্বের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। উপ-আঞ্চলিকতা ও বিমসটেককে ঘিরে রয়েছে দুই দেশের ব্যাপক সহযোগিতার ক্ষেত্র। এই সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকে বাংলাদেশের প্রসঙ্গটি আসতে পারে। ইতোমধ্যে সংবাদমাধ্যমে জানা গেছে, আঞ্চলিক ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ভারত বরাবরই আগ্রহী এবং প্রতিটি বড় সফরেই তারা প্রতিবেশীদের নিয়ে আলোচনা করে থাকে। তাই বিষয়টি স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলাদেশ নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতির আলোকে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে এবং আমাদের কূটনীতি নিয়ে অন্য দেশের আগ্রহ থাকতেই পারে। বিশ্বের বিভিন্ন ফোরামে শুধু বাংলাদেশ নয়, অন্য অনেক দেশ নিয়েই আলোচনা হয়। কিন্তু বাংলাদেশ প্রসঙ্গ নিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আলোচনা হলে তারা ভারত-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মাত্রার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার চেষ্টা করবেন-এটি আমার ধারণা। কারণ এই অঞ্চলে বাংলাদেশের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও বিশ্ব অর্থনীতিতে দেশটির ভূমিকা ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ অন্য পশ্চিমা রাষ্ট্রের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ। আমরা এখন আর অতীতের মতো আন্তর্জাতিক বাস্কেট কেস নই। এখন আর আমরা আগের মতো বৈদেশিক সাহায্যের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল নই। বাংলাদেশের বাজেটে বরাদ্দের ৯০ শতাংশ উন্নয়ন অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সম্পন্ন করা হয়। বাকি ১০ শতাংশ বৈদেশিক সাহায্য কিংবা বিনিয়োগের মাধ্যমে করা হয়। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ভারত এবং পাকিস্তানকেও অতিক্রম করে গিয়েছে। বাংলাদেশ জিডিপি হিসেবে পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে গিয়েছে অনেক আগে। দেশটিতে মেট্রোরেল পদ্মা সেতুসহ ব্যাপক অবকাঠামোর উন্নয়ন ঘটছে। ফলে আমাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতাও এখানে মনোযোগের দাবিদার। বাংলাদেশের সক্ষমতা যেমন বেড়েছে, তেমনই ভূরাজনৈতিক গুরুত্বও অনেক বেড়েছে। বাংলাদেশের প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমারের সঙ্গে চীনের একটি ভালো সম্পর্ক রয়েছে। আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিয়ানমারের সম্পর্কের টানাপড়েন দেখা যায়। অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে মিয়ানমারের সম্পর্ক অত্যন্ত ভালো। বিশ্বরাজনীতির জটিল সমীকরণেই বাংলাদেশ কূটনৈতিক প্রক্রিয়া চালু রেখেছে। তাই ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বৈঠকে বাংলাদেশের প্রসঙ্গ উপস্থাপন হওয়া মানে আমাদের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব যে বেড়েছে এরই সাক্ষ্য পাওয়া। বাংলাদেশকে ঘিরে যত আগ্রহ বাড়বে, ততই আমাদের সামনে কূটনৈতিক সম্ভাবনা বাড়বে। আর কূটনীতি হচ্ছে একটি গতিশীল ও পরিবর্তনশীল প্রক্রিয়া।

– ড. দেলোয়ার হোসেন: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; প্রেষণে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সদস্য হিসেবে নিয়োজিত।

প্রতিদিনের বাংলাদেশ এ প্রকাশিত [লিংক]