Multipolar World, Superpower Mentality and Global Crisis

0
174

প্রাচীন উপনিষদ থেকে শুরু করে মহামূল্যবান গ্রন্থসহ বিভিন্ন পর্যায়ে আমরা দেখি-পরিবর্তনই হচ্ছে বিশ্ব সমাজের বৈশিষ্ট্য। বিশ্ব পরিবর্তনশীল। একসময় নগররাষ্ট্রের অস্তিত্ব ছিল, যা ধীরে ধীরে সাম্রাজ্যকেন্দ্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বিলীন হয়ে যায়। ঐতিহাসিকভাবে রোমান সাম্রাজ্য, মিসরীয় সাম্রাজ্য, ইনকা সভ্যতা, ব্যাবিলনীয় সভ্যতা এবং আরও বিভিন্ন সাম্রাজ্য ও সভ্যতার পর্যায়ক্রমিক বিবর্তনের ফলে ইউরোপে জাতিরাষ্ট্র ব্যবস্থার উদ্ভব ঘটে। ১৬৪৮ সালে ইউরোপে ওয়েস্টফালিয়া শান্তিচুক্তির মাধ্যমে যে জাতিরাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে-সেটিও একটি একক রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। যে ইউরোপ জাতিরাষ্ট্র ব্যবস্থার চর্চা করছে, সেই ইউরোপেরই হাত ধরে বিশ্বে চালু হয় উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ এবং ধীরে ধীরে আরও শক্তিশালী রূপ ধারণ করে এ শাসনব্যবস্থা।

একদিকে আধুনিক জাতিরাষ্ট্র ব্যবস্থা এবং অন্যদিকে ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা পাশাপাশি প্রচলিত ছিল। এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার কোটি কোটি মানুষ ঔপনিবেশিক শাসনের জাঁতাকলে নিষ্পেষিত হয়েছে শতাব্দীর পর শতাব্দী। সেই উপনিবেশবাদও একসময় ভেঙে পড়ে। কিন্তু দেখা যায়, এ জাতিরাষ্ট্র ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই আরও বড় ধরনের পরিবর্তন সংঘটিত হয়, যে পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে ইউরোপকেন্দ্রিক বেশকিছু যুদ্ধ। ইউরোপে নেপোলিয়নের যুদ্ধ, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত হয়েছিল জাতিরাষ্ট্র ব্যবস্থার কারণে। ফলে জাতিরাষ্ট্র ব্যবস্থা সত্যিকার অর্থে বৈশ্বিক রূপ লাভ করতে পারেনি। তবে এশিয়া থেকে আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার সর্বত্র আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় অনুপ্রাণিত হয়ে জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম, রাজনীতি ও দার্শনিক চিন্তার উদ্ভব ঘটেছিল বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে।

ভারতের জাতীয়তাবাদী ও স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস আমরা জানি। সূর্যসেন, ক্ষুদিরাম থেকে শুরু করে মহাত্মা গান্ধীসহ তৎকালীন রাজনীতিবিদ, চিন্তাবিদ ও সাধারণ মানুষ যারাই ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তারা প্রত্যেকেই ছিলেন জাতীয়তাবাদী চেতনায় উজ্জীবিত। অবিভক্ত ভারতে এরই পরিপ্রেক্ষিতে ভারত ও পাকিস্তান দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পাকিস্তান যখন ঔপনিবেশিক শক্তি হিসাবে বাঙালি জাতিসত্তার ওপর আঘাত হানে, তখনই বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনা ও একটি জাতিরাষ্ট্র সৃষ্টির আকাঙ্ক্ষা তীব্র রূপ ধারণ করে। সেই জাতিরাষ্ট্র সৃষ্টির প্রধান কারিগর ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

সুতরাং, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তন বিশেষভাবে লক্ষণীয়। বিশ্ব পর্যায়ে পরিবর্তনগুলো যদি লক্ষ করি তবে দেখা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো তাদের উপনিবেশ হারিয়েছে। কিন্তু বিশ্বরাজনীতিতে আধিপত্য ও স্বার্থের যে সংঘাত, তা কখনোই থেমে থাকেনি। সব সময় শক্তি ও স্বার্থের রাজনীতি এবং আধিপত্য বিস্তারের প্রবণতা কোনো না কোনোভাবে বিদ্যমান ছিল। ফলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা দুটি ধারণার মধ্য দিয়ে এ বিষয়টির ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন-একটি হচ্ছে স্নায়ুযুদ্ধের বাস্তবতা এবং আরেকটি হচ্ছে দ্বিমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা।

এ দুটি ধারণা একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। আমরা যখন স্নায়ুযুদ্ধের বাস্তবতা সম্পর্কে কথা বলছি, তখন দেখতে পাই, বিশ্বযুদ্ধের পর শক্তিশালী দেশগুলোর মধ্যে অবিশ্বাস ও বৈরিতার সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। যে রাষ্ট্র ও শক্তিগুলো নিজেদের মধ্যে অবিশ্বাস ও বৈরিতার বীজ বপন করে, সে রাষ্ট্রগুলোই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে একসঙ্গে হিটলার ও মুসোলিনিদের পরাজিত করেছিল। অথচ যুদ্ধ-পরবর্তীকালীন সেই শক্তিগুলোই নতুন একটি বিশ্বব্যবস্থায় তাদের নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য নতুন ধরনের রাজনীতি ও সংঘাতে লিপ্ত হয়, যেটিকে বলা হয় স্নায়ুযুদ্ধ। আমরা একই সঙ্গে স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন দ্বিমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার আবির্ভাব দেখতে পাই। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা দেশগুলো এবং অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর মুখোমুখি অবস্থান পরিলক্ষিত হয়। তবে, প্রকৃতপক্ষে এককভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের শক্তিই ছিল এ দ্বিমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার মূল নিয়ামক। তাদের কৌশলগত অবস্থান বিশ্বের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করে। বিশেষ করে উপনিবেশ-উত্তর দেশগুলো যে ধরনের উন্নয়ন ও জাতি গঠনের স্বপ্ন দেখেছিল, সবকিছু এ স্নায়ুযুদ্ধের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। কিন্তু এ স্নায়ুযুদ্ধের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে উন্নয়নশীল বিশ্ব কিংবা তৃতীয় বিশ্বের অধিকাংশ দেশ এবং কোটি কোটি মানুষ তাদের স্বাধীনতা ও সমৃদ্ধির স্বপ্ন পূরণ করতে পারেনি। কারণ, তাদের মোকাবিলা করতে হয়েছিল পরাশক্তির মধ্যকার বৈরিতা, যার ফলে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর উন্নয়ন ও স্বাধীন সমাজ গঠনের পরিকল্পনা অনেকটাই অধরা থেকে যায়, যদিও এর মধ্যে কিছু ব্যতিক্রম আছে। তদানীন্তন তৃতীয় বিশ্বের কিছু দেশ অর্থনৈতিকভাবে উন্নতি করেছিল।

দ্বিমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার অবসান ঘটে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর রাষ্ট্রব্যবস্থা অবলুপ্তির মাধ্যমে। স্নায়ুযুদ্ধেরও সাময়িক পরিসমাপ্তি ঘটে। এরপর থেকেই একমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার ধারণার ফলস্বরূপ যুক্তরাষ্ট্রের একক ভূমিকা সামনে চলে আসে। এর মাধ্যমে আমরা বিশ্বশান্তি ও বিশ্বরাজনীতিকে নতুনভাবে দেখার প্রয়াস পাই। নতুন ব্যবস্থার পক্ষেও রয়েছে নতুন বিতর্ক, নতুন বিশ্লেষণ। অনেকে এ নতুন ব্যবস্থাকে উদারনৈতিক রাজনীতির চূড়ান্ত বিজয় হিসাবে দেখিয়েছেন। মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল হান্টিংটন বিশ্বের বিভিন্ন সভ্যতার দ্বন্দ্ব-সংঘাত সামনে নিয়ে আসেন। ফলে নব্বইয়ের দশক পুরোটাই ছিল বিশ্বব্যবস্থা নিয়ে বিভিন্ন বিতর্ক ও আলোচনার মধ্যে। এবং সে সময়ে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি হিসাবে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল।

তারপরও আমরা দেখেছি, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটলেও স্নায়ুযুদ্ধের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সামর্থ্য তুলনামূলকভাবে কমে আসে, যার প্রতিফলন ঘটে প্রথম ও দ্বিতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এককভাবে সেখানে যুদ্ধ পরিচালনা করা সম্ভব ছিল না। যুক্তরাষ্ট্র তখন একটি বহুজাতিক ঐক্য তৈরি করে সমমনা দেশগুলোর মাধ্যমে যুদ্ধ পরিচালনা করে। যুদ্ধের আর্থিক ভার অনেকটা জাপানের ওপর বর্তায়। জাপানের অর্থনৈতিক শক্তি, ন্যাটোর সামরিক সাহায্য, ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র যেমন: জার্মানি, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের সহযোগিতার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র তার বিশ্বব্যাপী প্রভাব বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিল। এর ফলে আমরা দেখতে পাই, বিশ্ব ধীরে ধীরে এক নতুন বাস্তবতার দিকে ধাবিত হয়। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১-এর হামলা বিশ্বে একটি নতুন মাত্রা যুক্ত করে; অর্থাৎ শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নয়, নিরাপত্তার বিষয়টিও, বিশেষ করে অরাষ্ট্রীয় শক্তি যেমন আল কায়দাসহ বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠীর উত্থান ঘটে এ সময় (২০০১) থেকে।

কিছুটা নীরবে হলেও এ নতুন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে নতুন বিশ্বশক্তি হিসাবে চীন ও ভারতের উত্থান ঘটে। বিশেষ করে ২০০০-এ যে নতুন দশকটি শুরু হয়, সে সময়ে চীন ও ভারত ব্যাপক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটাতে সক্ষম হয়। তাদের সামরিক শক্তিও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। ২০১০-এর পর উভয় দেশের অর্থনীতি ব্যাপকভাবে বিকশিত হতে থাকে। বিশেষভাবে লক্ষণীয় হয়ে ওঠে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। একপর্যায়ে দেখা যায়, চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হিসাবে সামনে চলে এসেছে। একই সঙ্গে চীনের সামরিক শক্তিরও ব্যাপক উন্নতি ঘটে। দেশটি বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার উদ্বৃত্তের একটি অর্থনীতি হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বড় অর্থনীতি হলেও বিশ্বের সবচেয়ে ঋণগ্রস্ত দেশে পরিণত হয়।

এরই মধ্যে জাপান, ফ্রান্স, জার্মানি, ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতিও সামনে চলে আসে। ফলে বিশ্বের প্রভাব বিস্তারকারী রাষ্ট্রগুলোর প্রভাবের ব্যাপক হ্রাস ঘটে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন ধরনের বিন্যাস তৈরি হয়। অর্থাৎ, বৃহৎ অর্থনীতি বলতে যে রাষ্ট্রগুলোকে বোঝানো হতো, সেই রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে আরও অর্ধ ডজন প্রায় সমপর্যায়ের অর্থনীতির বিকাশ ঘটে। এ অর্থনৈতিক শক্তিগুলো মূলত ইউরোপ ও পশ্চিমা বিশ্বের বাইরে অবস্থান করছে। ফলে বিদ্যমান বাস্তবতায় একমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার স্বপ্ন যারা দেখেছিল, তাদের সে স্বপ্ন সম্পূর্ণভাবে তিরোহিত হয়।

এখন বিশ্বব্যবস্থায় সম্পূর্ণ নতুন একটি মাত্রা আমরা দেখতে পাচ্ছি। কয়েকটি নতুন অর্থনৈতিক শক্তির আবির্ভাবে, একই সঙ্গে চীন ও ভারতের সামরিক উত্থানে একটি পর্যায়ে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, পৃথিবী বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থায় প্রবেশ করেছে। বিশেষ করে ২০১৫-১৬ সাল থেকে এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফলে বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্ব নিয়ে বিতর্কের সুযোগ খুবই কম। বর্তমানে চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, তাইওয়ান সংকট, কোরিয়া উপদ্বীপে বিরাজমান সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান কূটনীতি প্রমাণ করে বর্তমান বিশ্বে বহুমেরুকেন্দ্রিক প্রভাব বিস্তারের ধারণায় কতটা পরিবর্তন এসেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পরাশক্তির আধিপত্যের ধারণা থেকে যে মানসিকতা তৈরি হয়েছিল, সেই মানসিকতা দীর্ঘকাল ধরে বিশ্বরাজনীতিকে প্রভাবিত করেছে। এখনো সেই মানসিকতার প্রতিফলন আমরা দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু এ বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থায় পরাশক্তিসুলভ মানসিকতা বারবার ধাক্কা খাচ্ছে। বিশ্বায়নের ফলে এ ধারণা আরও অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

পরাশক্তিসুলভ মানসিকতার ব্যাখ্যায় বলা যায়-বিশ্বে আধিপত্য বিস্তারের জন্য আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের এবং বিশ্বে বিরাজমান অর্থনীতি, সংস্কৃতি, রাজনীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে শ্রেষ্ঠত্ব দাবির যে মানসিকতা এবং সেই মানসিকতার প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখার যে প্রক্রিয়া ও বাস্তবতা, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রচলিত ছিল। বর্তমানে এর সম্পূর্ণ পরিসমাপ্তি ঘটেছে বলা যেতে পারে।

বিশ্বায়নের ধারণায় যুক্ত হয়েছিল নব্য উদারবাদী মতাদর্শ, যা বিশ্বে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিল। কিন্তু গত দুই দশকে বিশ্বায়নের ধারণা সম্পূর্ণভাবে পালটে গেছে। আজ যখন বৈশ্বিক পর্যায়ে বা আঞ্চলিক পর্যায়ে বিভিন্ন রাষ্ট্র, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির মধ্যে আমরা সংযোগ দেখি, সেখানে বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য গুরুত্ব পাচ্ছে। মানুষের কাছে এখন তার নিজ দেশের সংস্কৃতি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই পশ্চিমা বিশ্বের বাইরেও অন্য অনেক দেশের সংস্কৃতি ও পরিচিতি গুরুত্ব লাভ করছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর তরুণ সমাজের মধ্যে অনেক বৈচিত্র্য লক্ষণীয়। বিশ্বায়নের ফলে ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির যে ভিন্নতা, যদিও তা আগে বিদ্যমান থাকলেও সামনে আসেনি-এখন তা সামনে চলে আসছে। রাজনৈতিক ভাবনার ক্ষেত্রে যে বৈচিত্র্য, সেটিও একসময় শক্তিশালী ছিল না; কিন্তু আজ সে অবস্থার পরিবর্তন আমরা দেখতে পাচ্ছি। সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তির বিন্যাস, বিভিন্ন দেশের সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে বিন্যাস-সব মিলে এক নতুন বাস্তবতার সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে পরাশক্তি কিংবা বৃহৎ শক্তিসুলভ মানসিকতার আমূল পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। এ বিষয়ে গবেষণা ও বিশ্লেষণ অত্যন্ত জরুরি। কারণ, বিশ্বরাজনীতিতে যে ধরনের চ্যালেঞ্জ সামনে এসেছে, বিশেষ করে চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার বৈরিতা, কোভিড-১৯ অতিমারি, বিশ্বের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল, পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকার সংকটগুলো বিবেচনায় নিলে দেখা যাবে, বিশ্ব একটি বহুমেরুকেন্দ্রিক ব্যবস্থায় অবস্থান করছে। এখানে পরাশক্তি কিংবা বৃহৎ শক্তিসুলভ মানসিকতা একেবারেই বেমানান ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

বিশ্বে চলমান সংকটগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা, রোহিঙ্গা সংকটের মতো মানবিক সমস্যা, ইউক্রেন যুদ্ধের মতো সভ্যতাবিধ্বংসী সমস্যা, তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে চরম সংঘাতপূর্ণ বাস্তবতা। এসব সংকট আরও বেশি ঘনীভূত হবে এবং তা বিশ্বকে ভয়াবহ পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারে, যদি পরাশক্তিসুলভ মানসিকতা পরিহার না করা হয় কিংবা যদি এটিকে নিয়ন্ত্রণ না করা হয়। এটি নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি; কারণ, বর্তমান বিশ্ব যে কোনো বিচারে একটি বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্ব। এটি একটি বৈচিত্র্যময় বিশ্ব, একটি নতুন চেতনার বিশ্ব। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের কথা বলছি আমরা। এ বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা কোনো এক নির্দিষ্ট শক্তির মধ্যে বা কোনো একটি মহাদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এ শক্তি সব রাষ্ট্রের মধ্যে নিহিত রয়েছে। এমনকি বিশ্বে শক্তিশালী দেশগুলোর কথাও যদি আমরা বলি, সেখানেও সেই সংখ্যা একটি, দুটি বা তিনটিও নয়-অনেক বেশি। ফলে বিশ্বে যে সংকটগুলো বিরাজ করছে, সে সংকটগুলোর সমাধান অত্যন্ত জরুরি এবং এর একমাত্র উপায় হচ্ছে বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্ব বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে নতুন নীতি ও পরিকল্পনা অবলম্বন করা। এটি পরাশক্তিসুলভ মানসিকতা দিয়ে কখনোই সম্ভব নয়। সেসব দেশের নাগরিক এবং সেই শক্তিগুলোর নেতৃত্ব এ বিষয়গুলো যত দ্রুত অনুধাবন করবে এবং তাদের জাতীয় নীতি ও কৌশলে তার প্রতিফলন ঘটাবে, বিশ্বের ততই মঙ্গল।

– ড. দেলোয়ার হোসেন: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; প্রেষণে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সদস্য হিসেবে নিয়োজিত।

যুগান্তরে প্রকাশিত [লিংক]