Major Achievements in the Diplomatic Arena of Bangladesh

0
203

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও কূটনীতিতে সাফল্যের পালক যুক্ত হলো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাপান, লন্ডন এবং ওয়াশিংটন সফরের মধ্য দিয়ে। বিভিন্ন কারণে প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরটি দুবার স্থগিত হওয়ার পর অবশেষে সম্পন্ন হয়েছে। নানা প্রতিবন্ধকতার পর স্বাভাবিকভাবেই তাই জাপান সফর সফল হওয়ার বিষয়টি আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। জাপানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার জন্য দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর আলোচনা ও সফরের ফলাফল ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে। বিগত ১৫ বছর ধরেই বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এবং এর সাফল্যের পেছনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে তিনি সদ্য বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বৈঠক সম্পন্ন করেছেন এবং এ লেখা পর্যন্ত তিনি সেখানেই অবস্থান করছেন। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উদযাপন করতেই প্রধানমন্ত্রীর ওয়াশিংটন সফর। একটি দেশের কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে একাধিক বিষয় থাকে। এক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপাক্ষিক কূটনীতির বিষয় জড়িত। বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশ্বব্যাংকের অবস্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফ বহুপাক্ষিক দাতা সংস্থা বলে পরিচিত। এ ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান এবং কর্তৃত্বও সুসংহত। বিগত ৭০-৭৫ বছরে এই দুটি সংস্থা বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন বাদেও অভ্যন্তরীণ ইতিবাচক পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও ব্যাপক অবদান রেখেছে। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ১৯৭২ সাল থেকে। স্বাধীনতার পর থেকে আজ অবধি বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে প্রথমেই উল্লেখ করতে হবে বিশ্বব্যাংকের নাম। দীর্ঘদিনের এই পরীক্ষিত সম্পর্কেও বড় পরিবর্তন এসেছিল। দাতা সংস্থাটির সঙ্গে পদ্মা সেতু নির্মাণ নিয়ে আমাদের সঙ্গে তৈরি হয় জটিলতা। পদ্মা সেতু প্রসঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে তাদের সম্পর্কে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছিল। পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির অভিযোগ তোলে সংস্থাটি। শুধু অভিযোগ উত্থাপনই নয়, এই অভিযোগে তারা পদ্মা সেতুতে বিনিয়োগ প্রক্রিয়া থেকেও সরে যায়। আশার কথা, পদ্মা সেতু বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ধারণা ইতোমধ্যে ভুল প্রমাণিত হয়েছে এবং বিশ্বব্যাংকের কোনো ধরনের সাহায্য ছাড়াই আমরা পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছি এবং অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছি। বিশ্বব্যাংক শুধু বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে না। বিশ্বের প্রায় ১৯০টি দেশ তাদের সদস্য। সে জন্য বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের বিভিন্ন দিক আমাদের খতিয়ে দেখতে হয়। মতানৈক্য থাকার পরও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আমাদের বর্তমান সম্পর্ক ভালো এবং এই মুহূর্তে বিশ্বব্যাংক আমাদের অর্থনৈতিক সহযোগী হিসেবে আগ্রহ দেখাচ্ছে।

বিগত কয়েক মাসে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচক সম্পর্কে ইতিবাচক মন্তব্য করেছে। এ বিষয়ে তারা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে। স্বভাবতই বাংলাদেশও বিশ্বব্যাংককে বিভিন্ন সময়ে পাশে চায়। প্রধানমন্ত্রী ওয়াশিংটন সফরে বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন সভায় বক্তব্য রাখবেন। এই সফর শেষ হওয়ার আগেই বাংলাদেশের প্রতি বিশ্বব্যাংকের আস্থা কতটা বেড়েছে তার উদাহরণ দেখা গেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতোমধ্যে তার একটি বক্তব্যে বলেছেন, বাংলাদেশ ২০৪১ সালের মধ্যে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ রূপকল্পের যে স্বপ্ন দেখছে, সেখানে বিশ্বব্যাংক একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে থাকবে। বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশের সাফল্য ও উন্নয়নের গল্প গুরুত্বের সঙ্গে স্বীকার করছে এবং সারা বিশ্বে তা প্রচারও করছে। এর পেছনে কারণও রয়েছে। উন্নয়নশীল বা প্রাক- ঔপনিবেশিক দেশের মধ্যে অল্প কয়েকটি দেশই বিশ্বব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বাংলাদেশের মতো উন্নতি দেখাতে পেরেছে। নানা প্রতিবন্ধকতা থাকার পরও বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশ অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে যে সফলতা দেখিয়েছে তা আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই সংস্থাগুলো স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছে। অর্থনীতি দিয়েই এই উন্নয়নের যাত্রা শুরু হয়েছে এবং কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এই উন্নয়নকে একটি স্থির রূপ দিতে শুরু করেছে। কারণ এই স্বীকৃতি বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার ফল। দেশের বাইরে যেকোনো রাষ্ট্র কিংবা দাতা সংস্থার সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের দায়িত্ব কূটনৈতিক চ্যানেলকেই নিতে হয়। কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই যোগাযোগ, আস্থা বৃদ্ধি এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের কাজ করতে হয়। কূটনৈতিক সম্পর্কের ফলাফল হিসেবেই আমরা বিভিন্ন ঋণ বা চুক্তির ফলাফল পাই। তাই সাফল্য যাত্রার ভিত্তিভূমে অর্থনৈতিক কাঠামো থাকলেও এর শুরু ও শেষ কূটনীতির মাধ্যমে।

প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানেরই নিজস্ব স্বার্থ ও উদ্দেশ্য থাকে। রাষ্ট্র কিংবা দাতা সংস্থা এর বাইরে নয়। ১৯৪৪ সালে এক সম্মেলনের পর পশ্চিমা রাষ্ট্রের বাজার অর্থনীতির দর্শন পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নেয় বিশ্বব্যাংক। বিশ্বব্যাংক কোনো দেশের সঙ্গে কাজ করার সময় অর্থনৈতিক সংস্কারের কথা বলে। বিগত ৭০-৭৫ বছরে এই অর্থনৈতিক সংস্কারকেই ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা শর্ত হিসেবে দিয়ে আসছে। বাংলাদেশকেও তারা বিভিন্ন সময়ে এসব শর্ত দিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ বরাবরই এসব শর্ত পূরণ করার পাশাপাশি নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রেখে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করেছে। এই মুহূর্তে আমাদের সামনে আরও বড় একটি স্বপ্নের হাতছানি। ২০২৬ সাল থেকে আমরা উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পেতে চলেছি। এ ছাড়া ২০৪১ সালের মধ্যে ‘স্মার্ট’ বাংলাদেশ’ ভিশনও পূরণ করার আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। এই সফলতা অর্জনের জন্যও বিশ্বব্যাংকের সাহায্য আমাদের দরকার। আবার বিশ্ব অর্থনীতি এবং ভূ-রাজনৈতিকমণ্ডলের গুরুত্ব বিবেচনায় বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশকে পাশে চায়। মনে রাখতে হবে, পশ্চিমা দেশগুলোর কূটনীতি এবং তাদের উদ্দেশ্যের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের অবস্থান মিলেমিশে আছে। বিশ্বব্যাংক ভূ-রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। একথা সত্য, বিশ্বব্যাংক আলাদা একটি সংস্থা হিসেবে কাজ করে। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কোন্নয়ন মানে পশ্চিমা বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ভালো হওয়ার সুযোগ বাড়ছে। প্রধানমন্ত্রীর এই সফর আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত রাখছে কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে।

বাংলাদেশের কূটনীতি তিনটি পর্যায়ে পরিচালিত। প্রথম পর্যায়ে বাংলাদেশ বড় শক্তির দেশ যেমন- যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা রাখে। দ্বিতীয় পর্যায়ে তুরস্ক, সৌদি আরব কিংবা মেক্সিকোর মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। তৃতীয় পর্যায়ে, তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রের সঙ্গেও সম্পর্ক রক্ষার বিষয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। প্রতিটি পর্যায়েই বাংলাদেশ ব্যাপক সাফল্য দেখিয়েছে। এই তিনটি পর্যায়ে বাংলাদেশ কোথাও গাফিলতি করেনি বিধায় আজ সবার সঙ্গে মৈত্রী, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ এই মূলমন্ত্র সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারছে। শুধু পশ্চিমা শক্তিধর রাষ্ট্রের সম্পর্ক ভালো হচ্ছে এমন নয়। বাংলাদেশের সঙ্গে আসিয়ান রাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্যসহ অন্যান্য অনেক রাষ্ট্রের সঙ্গেই ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। অপেক্ষাকৃত ছোট বা কম গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রের মধ্যেও বড় গুরুত্ব শনাক্ত করে সম্পর্ক গড়ে তোলা হচ্ছে। আমরা শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ভারত, চীনসহ অন্যান্য ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করার বিষয়ে কাজ করছি এমন নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করায় অন্যান্য দেশও তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারছে। বিশ্বে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করার ক্ষেত্রে এই সাফল্যের দরুন অন্যান্য দেশও বাংলাদেশের বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে। উন্নয়নের বিষয়টি বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন পন্থায় সম্পন্ন করছে। স্নায়ুযুদ্ধে যেমন কয়েকটি রাষ্ট্রের কাছেই ক্ষমতা সীমাবদ্ধ ছিল- এমনটি এখন আর নয়। বহুমেরুকেন্দ্রিক এই বিশ্বে বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন মাত্রায় অবদান রাখতে পারে। এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক কূটনীতি চালু রেখেছে। বাংলাদেশের কূটনীতিতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অনেকগুলো বিষয় রয়েছে। তার মধ্যে রোহিঙ্গা ইস্যু বরাবরই প্রথম দিকে থাকে। প্রধানমন্ত্রীর তিনটি দেশ সফরের সময় রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আলোচনা উঠেছে। তবে এই সফরের সঙ্গে রোহিঙ্গা ইস্যুকে মিলিয়ে ফেলা যাবে না। তবে প্রতিটি সফরেই এই ইস্যুটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে উঠে আসে। আমরা দেখেছি, জাপান সফরের সময়েও প্রধানমন্ত্রী এই বিষয়টি তুলেছিলেন। এ বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ বরাবরই তৎপর। এই মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রীর এই বিদেশ সফর এবং বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের বিষয়টি থেকে কূটনৈতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ঈর্ষণীয় সাফল্যের প্রমাণ পাওয়া গেছে। ভবিষ্যতে পশ্চিমা দেশ বাদেও বিশ্বরাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান কেমন হতে পারে তা সহজেই অনুধাবন করা যাচ্ছে।

– ড. দেলোয়ার হোসেন: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; প্রেষণে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সদস্য হিসেবে নিয়োজিত।

প্রতিদিনের বাংলাদেশে প্রকাশিত [লিংক]