New Prospects in the Middle East Politics

0
269

গত ১০ মার্চ সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যকার বৈরিতা প্রশমিত করার লক্ষ্যে এক বিশেষ ঘোষণার আশ্বাস আসে দুই পক্ষ থেকে।

বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত এ আলোচনার মধ্যস্থতায় ছিল চীন। চারদিনের আলোচনার পর মধ্যপ্রাচ্যের দুই আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইরান ও সৌদি আরব কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করতে সম্মত হয়েছে।

তাৎপর্যপূর্ণ এ কূটনৈতিক পরিবর্তনটি নিঃসন্দেহে সব দেশের জন্য, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কারণ বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক গুরুত্ব এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে দুটি দেশের ভূমিকা অপরিসীম।

উল্লেখ্য, ২০১৬ সাল থেকে ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি শুরু হয়। ইরানের একজন ধর্মীয় নেতার মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে দু’দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের এ অবনমন। তবে দুটি দেশের মধ্যে বহু আগে থেকেই আদর্শগত, রাজনৈতিক ও মধ্যপ্রাচ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বৈরিতা ছিল। ইয়েমেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে দু’দেশের মধ্যে সম্পর্কের তিক্ততা আরও ঘনীভূত হয় এবং পরে কোভিড-১৯ ও ইউক্রেন যুদ্ধ সমগ্র পরিস্থিতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করে।

বেইজিংয়ে আলোচনার পর প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, সৌদি আরব ও ইরান তাদের দূতাবাস আবার চালু করতে সম্মত হয়েছে। এছাড়াও উভয়পক্ষ পারস্পরিক সার্বভৌমত্বকে সম্মান করতে এবং একে অপরের বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করতে সম্মত হয়েছে। তাই বলা যায়, সৌদি-ইরান সমঝোতা একটি পরিবর্তিত কৌশলগত অবস্থা এবং এটি পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনীতির ইঙ্গিতবাহী।

অন্যদিকে ব্যাপক এ রাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনে চীনের ভূমিকাকে খুব উল্লেখযোগ্যভাবে তুলে ধরা হচ্ছে। বলা যায়, চীনের মধ্যস্থতায় ইরান ও সৌদি আরবের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়টি বিশ্ব রাজনীতিতে একটি নতুন বিষয়। অন্যদিকে এ ঘটনা চীনের একটি কূটনৈতিক সাফল্য, যা পরাশক্তি হিসাবে দেশটিকে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

অন্যদিকে কেন চীন এ কৌশল অবলম্বন করল এবং কেনইবা সৌদি আরব ও ইরান চীনের এ মধ্যস্থতা মেনে নিল, এটি বর্তমান সময়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। চীনের বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকার অংশ হিসাবে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যকার এ আশ্বাস সামনে এসেছে। অন্যদিকে সৌদি আরব ও ইরান দুই পক্ষেরই বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করে তাদের আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসতে পারা নিঃসন্দেহে চীনের একটি কূটনৈতিক বিজয়।

সম্প্রতি বিভিন্ন আঞ্চলিক জোটে পরিবর্তন এসেছে এবং নতুন করে আঞ্চলিক পর্যায়ে পরাশক্তিগুলোর একটি সরব উপস্থিতি আমরা দেখতে পাচ্ছি। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্কের টানাপোড়নে দেখা গেছে। এর বিপরীতে চীন মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে তার অবস্থান আরও সুদৃঢ় করার বিভিন্ন প্রয়াস নিয়ে এগিয়ে চলেছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের মাধ্যমে চীন এ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করে চলেছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় আমরা দেখতে পাই, ইয়েমেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের সামরিক অভিযান ও পারস্পরিক নেতিবাচক সম্পর্ক থাকার ফলে দেশ দুটি নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন বিষয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে।

তবে ইরানে এ চুক্তিকে স্বাগত জানানো হয়েছে। দেশটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা উত্তেজনা হ্রাস এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদারের একটি পদক্ষেপ হিসাবে চুক্তির প্রশংসা করেছেন। এছাড়া এ চুক্তি পশ্চিমা বিশ্ব ও ইসরাইলের ‘পরাজয়ের’ ইঙ্গিত দেয় বলেও ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলোয় উল্লেখ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, পশ্চিমা অবরোধের কারণে ইরান অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং বর্তমানে একটি আন্দোলনকে কেন্দ্র করে একটি গোষ্ঠী ইরানের চলমান রাজনীতিকে অস্থিতিশীল করে রেখেছে।

২০১২ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত টানা ১০ বছর ধরে চীন ইরানের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। ২০২২ সালে চীন-ইরান বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৫.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৭ শতাংশ বেশি। এর ফলে ২০২১ সালের তুলনায় ২০২২ সালে ইরানে চীনের রপ্তানি ১৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৯.৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। এটি চীনের সঙ্গে ইরানের সুসম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়। মূলত এটিই ইরানকে আলোচনার টেবিলে বসার ব্যাপারে ভূমিকা রেখেছে। বর্তমান অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার একটি পন্থাও এটি।

অন্যদিকে সৌদি আরবের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার চীন। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে চীন ৩.৫৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে সৌদি আরবে এবং সৌদি আরব থেকে ৫.৬৭ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে চীন। চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি সরকারের ইরানের সঙ্গে আলোচনায় ইতিবাচক অবস্থান বোধগম্য। চীন বিশ্বের অপরিশোধিত তেলের বৃহত্তম ক্রেতা এবং দেশটি অন্য যে কোনো উৎসের তুলনায় সৌদি আরব থেকে বেশি তেল আমদানি করে থাকে। ২০২১ সালে দুই দেশের মধ্যে ৮৭.৩ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের প্রায় অর্ধেকই ছিল চীনের অপরিশোধিত তেল আমদানি, যা সৌদি আরব থেকে চীনের মোট আমদানির ৭৭ শতাংশ। বিপরীতে, সৌদি আরব প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম, টেলিফোন এবং অন্যান্য সরঞ্জামসহ ৩০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের পণ্য ২০২২ সালে চীন থেকে আমদানি করেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে সৌদি আরবের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয়ে থাকে। দেশটির বৈদেশিক নীতি আঞ্চলিক, এমনকি বৈশ্বিক নীতিকেও প্রভাবিত করে থাকে। প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান ২০৩০ সালকে টার্গেট করে সৌদি আরবে একটি আমূল পরিবর্তনের রূপরেখা তৈরি করেছেন। এক্ষেত্রে আঞ্চলিক সহযোগিতা একটি নিয়ামক, যে কারণে সৌদি সরকার ইরানের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চাচ্ছে। আবার ইয়েমেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে সৌদি আরব ইতোমধ্যে একটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপের মুখে আছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চলমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক দুরবস্থা, যা সৌদি অর্থনীতিকে একটি চাপের মধ্যে রেখেছে। তাই বোঝাই যাচ্ছে চীনের মধ্যস্থতার গুরুত্ব।

যা হোক, এ পরিবর্তনের মাধ্যমে বিশ্বে মধ্যপ্রাচ্যের ভূমিকা আরও বাড়বে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে চীন একটি নতুন ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে যাচ্ছে। চীনের জন্য এ কূটনৈতিক সফলতা একটি গেম চেঞ্জার হিসাবে কাজ করবে, যা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে পশ্চিমা বিশ্বের প্রভাবকে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করবে। এছাড়া এ সমঝোতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার রেখে যাওয়া কৌশলগত শূন্যতা পূরণে এবং একটি বিশ্বস্ত বৈশ্বিক অংশীদার হিসাবে আত্মপ্রকাশে চীনের এক নজিরবিহীন অর্জন।

সৌদি আরব ও ইরানের সুসম্পর্ক সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা এ অঞ্চলকে সামনের দিনগুলোয় সংঘাতবিহীন অবস্থানে নিয়ে যেতে এবং চলমান সংকটগুলো নিরসনে কূটনৈতিক সমঝোতার ভূমিকাটি সামনে নিয়ে আসবে। এ ধরনের শান্তি প্রতিষ্ঠার ফলে পরিবর্তন দেখা যেতে পারে অন্যান্য আঞ্চলিক অমীমাংসিত ইস্যুতেও। বস্তুত সৌদি আরব ও ইরানের এ সমঝোতা একটি উদাহরণ হয়ে থাকবে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সংকট নিরসনের ক্ষেত্রে।

আগামী দিনগুলোয় সৌদি-ইরান সম্পর্ক পরীক্ষিত হবে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক উন্নয়নের ওপর নির্ভর করে। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ইসরাইলের চাপ, ইরান-ইউরোপের সম্পর্কের গতিপথ এবং ইরানের আন্তরিকতা ও সদিচ্ছা নির্ধারণ করবে চুক্তিটির ভবিষ্যৎ। এর সঙ্গে রয়েছে সৌদি আরবের সতর্ক পদক্ষেপ। অন্যদিকে, সৌদি আরব ও ইরান একত্রে কাজ করলে ইয়েমেন যুদ্ধের মতো একটি বিষয়ের সমাপ্তি খুব দ্রুতই আমরা দেখতে পাব, যা নিঃসন্দেহে হবে বিশ্ব মানবতার একটি বিজয়। এছাড়া চীনের কূটনৈতিক সফলতা ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে শান্তি প্রতিষ্ঠার এ নতুন কৌশল ও সমঝোতা চুক্তি পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে চীনের প্রতিযোগিতার একটি নতুন ক্ষেত্র তৈরি করেছে। তবে এসব সমীকরণ নির্ভর করছে মূলত এ সমঝোতার সফল বাস্তবায়নের ওপর।

– ড. দেলোয়ার হোসেন: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; প্রেষণে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সদস্য হিসেবে নিয়োজিত।

যুগান্তরে প্রকাশিত [লিংক]