Prime Minister’s Qatar Visit and the New Dimension in Bilateral Relations

397

‘কাতার সব সময় বাংলাদেশকে সহায়তা করতে এগিয়ে আসবে।’

-কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি, ২০২৩

জাতিসংঘের পঞ্চম এলডিসি সম্মেলন উপলক্ষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত পাঁচ মার্চ কাতার সফর করেছেন। এই সফর নিয়ে বিভিন্ন ধরনের বিশ্লেষণ হচ্ছে। কেন না এই সফরটি নিঃসন্দেহে ব্যাপক তাৎপর্যপূর্ণ ও বহুমাত্রিক। একদিকে এটি যেমন আন্তর্জাতিক কূটনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ, সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ কাতার সম্পর্কে যোগ করেছে নতুন মাত্রা। ফলে বলা যায় যে, এই সফরের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপাক্ষিক কূটনীতির একটি নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে।

জাতিসংঘের পঞ্চম এলডিসি সম্মেলনটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কেননা দুবার স্থগিত হওয়ার পর এবার এ সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়। ২০২১ সালে অনুষ্ঠিত হওয়ার বদলে পিছিয়ে এর সময় নির্ধারিত হয়েছে ২০২৩ সালে। সম্মেলন পেছানোর জন্য দায়ী প্রধান কারণটির মধ্যে এর গুরুত্ব নিহিত আছে। এটি হচ্ছে কোভিড-১৯ বৈশ্বিক মহামারি। এই সম্মেলনের অর্জনগুলো নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে তুলে ধরেছেন সেই সঙ্গে এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনের জন্য আহ্বান জানান।

বিশেষ করে বর্তমান সময়ের ইউক্রেন যুদ্ধ ও কোভিড-১৯-উত্তর বিশ্বে বিভিন্ন দেশ যেভাবে এর ভয়াবহ প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে, সেই প্রেক্ষাপটে এই সহযোগিতা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে শুধু অর্থ সহযোগিতার বিষয়টি মুখ্য নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাজারে উন্নয়নশীল দেশগুলোর আরও বেশি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, এই দেশগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর করা এবং এই দেশগুলো থেকে যে মানবসম্পদ উন্নত বিশ্বে কাজ করছে তাদের কাজের আরও ফলপ্রসূ মূল্যায়ন ইত্যাদি সামনে আনতে হবে। একই সঙ্গে বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা বৃদ্ধি নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কথা বলেছেন।

তবে এই সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে বাংলাদেশ-কাতার সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। আমরা জানি যে বাংলাদেশ এবং কাতারের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে ব্যাপক ইতিবাচক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে বিগত এক দশকে। যদিও সব সময় কাতার এবং বাংলাদেশ বন্ধুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবেই পরিগণিত হয়ে আসছে। তবে অতি সম্প্রতি এই সম্পর্ক আরও দৃঢ় ও শক্তিশালী হচ্ছে। একসময় বাংলাদেশ-কাতার সম্পর্কটি শুধু বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিকদের বাজার হিসেবেই দেখা হতো। এখন অবশ্য এই সম্পর্কের অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচিত হয়েছে। বলিষ্ঠ অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ।

এই সফরে যেসব বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে তার মধ্যে একটি হচ্ছে জ্বালানি সহযোগিতা। বাংলদেশ চাচ্ছে কাতার আরও বেশি এলএনজি সরবরাহ করুক। বাংলাদেশ এখন ৪০ কনটেইনার মূল্যের বিদ্যুৎ আমদানি করছে, বা ১ দশমিক ৮ থেকে ২ দশমিক ৫ এমটিএ। বাংলাদেশ আরও একটি এমটিএ চায়, যা ১৬-১৭ কনটেইনারের সমমানের। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ করে আমির বলেন, ‘আপনার কাতার ছাড়ার আগে আমার জ্বালানিমন্ত্রী এ বিষয়ে আপনার সঙ্গে আলোচনা করবেন।’ দ্বিতীয় সহযোগিতার জায়গাটি হচ্ছে কাতারে বসবাসরত প্রায় ৫ লক্ষ বাংলাদেশি কাজ করছে, তাদের জীবনমান বৃদ্ধিতে সহায়তা করা। প্রবাসী শ্রমিকদের প্রতি কাতারের আরও অনুকূল আচরণ প্রত্যাশা করে বাংলাদেশ। সঙ্গে নতুন করে বাংলাদেশ থেকে প্রবাসী গ্রহণের পথও যেন উন্মোচিত হয় সেদিকটিও লক্ষ করতে আহ্বান জানায় বাংলাদেশ।

আমরা জানি যে, বাংলাদেশ এবং কাতার দুই দেশের মধ্যে তখনই বড় ধরনের সহযোগিতা হতে পারে যখন দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্ব একই সুরে কথা বলবেন এবং এই সফরে দেখা যায় যে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কাতারের আমির অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে আলোচনা সম্পন্ন করেন। সেই আলোচনার পরিবেশ ও বিষয়বস্তু বিবেচনায় নিলে দেখা যাচ্ছে যে কাতার বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু হিসেবে বিবেচনা করছে।

অপরদিকে বাংলাদেশ তার নিজের গুরুত্ব সঠিকভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও সেটি ধরে রাখা, সার্বিকভাবে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া তথাপি এশিয়াজুড়ে যে এক অবস্থান তৈরি করেছে তা কাতার অনুধাবন করতে পেরেছে। এর পাশাপাশি, বাংলাদেশ বিগত কয়েক বছর ধরে একটি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, যা বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য এবং বিদেশি বিনিয়োগের জন্য সহায়ক- আর তা হচ্ছে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের মাধ্যমে বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি করা, যেখানে বিদেশি বিনিয়োগ ইতোমধ্যেই আসছে।

বাংলাদেশ জাপান, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া বা ভারতসহ কিছু দেশকে বিনিয়োগের জন্য কিছু অঞ্চল উন্মুক্ত করে দিয়েছে। একইভাবে কাতারের জন্য এই ধরনের একটি অঞ্চল উন্মুক্ত করে দেয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কেননা বাংলাদেশে বিনিয়োগের যে অনুকূল পরিবেশ আছে বিশেষ করে একটি শ্রমঘন অর্থনীতি হিসেবে বাংলাদেশ সব সময়ই এগিয়ে থাকে অন্যদের থেকে। সঙ্গে যোগ হয়েছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও দক্ষ নেতৃত্ব। এসব বিষয় মিলিয়েই বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ একটি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে পেরেছে।

পাশাপাশি বাংলাদেশের একটি বড় বাজারও রয়েছে। তাই কাতারের বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার বিষয়টি উঠে এসেছে সামনে। বিজনেস সামিটে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে বিনিয়োগ পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন। কাতারের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন তিনি। তাই একটি বড় অগ্রগতির আশা করাই যায়।

এর বাইরে কাতারের সঙ্গে আমাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক শক্তিশালী হচ্ছে। বাংলাদেশ ও কাতার একটি অভিন্ন অবস্থান থেকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিষয়, বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জকে দেখছে। স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে কাতারের আরও বেশি ভূমিকা আশা করছে। বিশেষ করে যখন রোহিঙ্গাদের জন্য বৈশ্বিক সহায়তার মাত্রা হ্রাস পাচ্ছে, তখন ওআইসিভুক্ত দেশগুলো এগিয়ে আসতে পারে আর এখানে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারে কাতার। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিষয়টির প্রতি গুরুত্বরোপ থেকে কাতারের কাছ থেকে নতুন সহায়তার আশা করা যায়।

সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যে কাতার বর্তমান বিশ্বে বিশেষ করে আরব বিশ্বে তথা মধ্যপ্রাচ্যে একটি বিশেষ অবস্থান তৈরি করেছে। কাতার তার ভৌগোলিক অবস্থান, জ্বালানি শক্তি ও সফট পাওয়ারের জন্য এক বিশেষ কূটনৈতিক মর্যাদা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। কিছুদিন আগে শেষ হওয়া বিশ্বকাপ ফুটবল এর এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাই কাতারের সঙ্গে আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও গভীরতা ও ব্যাপকতার মাধ্যমে লাভবান হতে পারে দুই দেশই।

তবে এ ক্ষেত্রে মুসলিম বিশ্বে বিশেষ করে আরব বিশ্বে বাংলাদেশ সম্পর্কে গতানুগতিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আরও দ্রুত হওয়া উচিত। কেননা আশির দশকের বাংলাদেশ এখন আর নেই। এই বাংলাদেশ এক ভিন্ন বাংলাদেশ। ভারত, মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়ার মতো বাংলাদেশকে একই নজরে দেখা উচিত কাতারসহ সমগ্র আরব বিশ্বের। আশির দশকের মতো শুধু শ্রমিকনির্ভর অর্থনীতি এখন আর বাংলাদেশ নেই। আর এর প্রতিফলন দেখা যায় কাতারের আমিরের বাংলাদেশের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি দেখে।

পাশাপাশি মুসলিম বিশ্বে বাংলাদেশ এক বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ কাতারের সম্পর্ক বহু পুরোনো, সেই ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধুর ওআইসি সম্মেলনে যোগদান থেকে এর সূত্রপাত। মাঝে চার দশক অতিক্রম করে এই সম্পর্ক এখন এক শক্তিশালী কাঠামোর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। দুই দেশ এখন এক উইন-উইন অবস্থা তৈরির জন্য কাজ করে যাচ্ছে। তাই আশা করাই যায় যে, পারস্পরিক আস্থা ও নির্ভরশীলতার যে দৃষ্টিভঙ্গি সেটিকে সামনে রেখে একসঙ্গে বাংলাদেশ ও কাতার এগিয়ে যাবে এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কাতার আরও দৃঢ় ভূমিকা পালন করবে, একই সঙ্গে বাংলাদেশও কাতারের সঙ্গে বন্ধুত্ব আরও সুসংহত করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে। দুই দেশের মধ্যে অংশীদারিভিত্তিক যে সম্পর্ক তা এগিয়ে যাবে বহু দূর।

– ড. দেলোয়ার হোসেন: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; প্রেষণে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সদস্য হিসেবে নিয়োজিত।

দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত [লিংক]