US Policy in the Region and Bangladesh’s Response

320

বাংলাদেশে প্রায় একই সময়ে সফরে এসেছেন তিন দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়ার শীর্ষ পর্যায়ের তিন কর্মকর্তার সফর পূর্ব-পশ্চিমে বাংলাদেশের গুরুত্ব বৃদ্ধির পরিচায়ক। এর আগে গত মাসে বাংলাদেশ ঘুরে গেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লুসহ যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ তিন ব্যক্তি। বস্তুত বহু দিন ধরেই বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব বিশ্বব্যাপী আলোচনার বিষয়। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চীনের উত্থান এবং শক্তিধর রাষ্ট্র হয়ে ওঠা, ভারতের উত্থান এবং জাপানের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কারণে এ অঞ্চলের প্রতি বিশ্বের তীক্ষষ্ট নজর রয়েছে। আমরা দেখেছি, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এশিয়ার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল নির্ধারণ করেছেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সে ধারা অক্ষুণ্ণ রেখেছিলেন এবং বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসনেও সেই গুরুত্বের বিষয়টি অনেক বেশি স্পষ্ট।

ধীরে ধীরে এশিয়ায় চীনের উত্থানই হয়নি, বরং নানা দিক থেকে দেশটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বীও হয়ে উঠেছে। চীন যেমন অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে গেছে, তেমনি তার বিভিন্ন উদ্যোগ পশ্চিমাদের কাছে হুমকির কারণ হয়ে উঠছে। চীন ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ উদ্যোগ নিয়েছে। এখানে চীন, ভারত ও জাপানের মধ্যকার পারস্পরিক প্রতিযোগিতা যেমন রয়েছে, তেমনি বৈশ্বিক সম্পর্কের দিক থেকেও তাদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্পষ্ট। বৈশ্বিক এ খেলায় বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতির আলোকে কৌশলগত অবস্থান ধরে রেখেছে। বঙ্গবন্ধুর সময় থেকে পররাষ্ট্রনীতি ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়’ অনুযায়ী বাংলাদেশ এগিয়ে গেছে। সেই অনুযায়ী ভারসাম্য রেখে বাংলাদেশ সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। এর সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, এখানকার বাজার, প্রবাসীদের অবদান, শক্তিশালী কৃষি ইত্যাদি মিলিয়ে বাংলাদেশ তার অবস্থান বিশ্বে আরও দৃঢ় করেছে।

বাংলাদেশের অবস্থা ও অবস্থানের গুরুত্বের নিরিখেই বিদেশিদের সফর দেখতে হবে। তবে বলার অপেক্ষা রাখে না, বাংলাদেশের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বহুমুখী। বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক এ সম্পর্ক ইতোমধ্যে ৫০ বছর অতিক্রম করেছে। তারপরও কিছু বিষয়ে দেশটির সঙ্গে সাম্প্রতিক এক ধরনের টানাপোড়েন আমরা দেখেছি। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র র‌্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এর আগে দেশটি জিএসপি সুবিধা স্থগিত করায় পণ্যের বাজারে উদ্বেগ তৈরি হয়। গণতন্ত্র, মানবাধিকারসহ বেশ কিছু বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অযাচিত মন্তব্যও চোখে পড়ার মতো। তবে গত মাসে ডোনাল্ড লুর সফরের পর সমকালেই আমি লিখেছি, বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যা কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে, সেখান থেকে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ডোনাল্ড লুর সফর ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছে। আমরা দেখেছি, লু র‌্যাবের বিষয়ে বলেছেন- র‌্যাবের বিচারবহির্ভূত হত্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে, যা অসাধারণ অগ্রগতি। এর মাধ্যমে এটিই প্রমাণ হয়- র‌্যাব মানবাধিকারকে সম্মান করে জঙ্গিবাদ দমন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করতে পারে। শ্রম অধিকার বিষয়েও বাংলাদেশের অগ্রগতির বিষয়টি ডোনাল্ড লু স্বীকার করেছেন। জিএসপি সুবিধারও ইতিবাচক বার্তা এসেছিল তাঁর পক্ষ থেকে। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন, যখনই জিএসপি দেওয়ার অনুমোদন আসবে, বাংলাদেশ সেই তালিকায় সর্বপ্রথম এ সুবিধা পাবে। সুতরাং লুর সফরেই বলা চলে, দুই দেশের সম্পর্ক টানাপোড়েন থেকে বের হয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্র্পীর উপদেষ্টা ও পররাষ্ট্র দপ্তরের কাউন্সিলর ডেরেক এইচ শোলের এবারের সফরে যে গণতন্ত্র, মানাবাধিকার কিংবা নির্বাচনের কথা বলা হচ্ছে, তার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। মনে রাখতে হবে, বাইডেন প্রশাসন সারাবিশ্বেই গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের কথা বলে থাকে। যদিও তাদের অবস্থানে স্ববিরোধিতা রয়েছে। রাষ্ট্রভেদে তাদের ভিন্ন অবস্থান দেখা যায়। তবে কূটনৈতিক দিক থেকে এটি একেবারে অস্বাভাবিকও নয়। আমরা মনে করি, এটি তারা তাদের পররাষ্ট্রনীতির আলোকেই বলে থাকে। তারপরও বলার অপেক্ষা রাখে না, বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকারেই এগুলো রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ডেরেক শোলের নেতৃত্বে মার্কিন প্রতিনিধি দলের সৌজন্য সাক্ষাতে প্রধানমন্ত্রী সেটি বলেছেন। তিনি বলেছেন, নির্বাচন কমিশন (ইসি) সম্পূর্ণ স্বাধীন হওয়ায় আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে। প্রধানমন্ত্রী গণতন্ত্রের জন্য লড়াইয়ের কথা বলে ভোট কারচুপির মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার চিন্তাও নাকচ করে দিয়েছেন। অর্থাৎ বাংলাদেশ নিজেদের স্বার্থেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণে বদ্ধপরিকর। এখানে অন্যদের তাগিদ দেওয়ার অবকাশ নেই। তারপরও যেহেতু পশ্চিমা বিশ্ব বিষয়টিতে আগ্রহী, সেহেতু তাদের কাছে সেই বার্তা দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রতিবেশী ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিনয় কোয়াত্রার এবারের সফরও উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি নয়াদিল্লির পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। তিনি মূলত এসেছেন এ বছরে সেপ্টেম্বরে ভারতে অনুষ্ঠেয় জি২০ সম্মেলনে দাওয়াত দেওয়ার জন্য। নিজেদের মধ্যে বিভাজন থাকলেও বলা যায়, জি২০ বর্তমান বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সংগঠন। সেখানে নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আন্তর্জাতিক বিশ্বের সামনে বাংলাদেশকে উপস্থাপনের সেটিও হবে বড় উপলক্ষ। তবে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব যেভাবে প্রধামন্ত্রীকে বলেছেন- ‘আপনার প্রতি এবং আপনার নেতৃত্বের প্রতি আমাদের পূর্ণাঙ্গ সমর্থন রয়েছে’; তা অনুধাবনযোগ্য। বিশেষ করে গত ১৪ বছরে ভারত-বাংলাদেশের বন্ধুত্ব বিভিন্ন দিক থেকে গভীর এবং বিনয় কোয়াত্রার কণ্ঠে শোনা গেছে তারই প্রতিধ্বনি। তবে দুই দেশের মধ্যে তিস্তা চুক্তি, সীমান্তে হত্যা কিংবা বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর যেসব বিষয় রয়েছে, সেগুলো নিয়েও আলোচনার আশ্বাস রয়েছে।

বাংলাদেশ ও কোরিয়ার মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর উপলক্ষে সফরে এসেছিলেন কোরিয়া প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্টের দূত এবং ভবিষ্যৎ কৌশলবিষয়ক সিনিয়র সচিব জাং সুং মিন। কোরিয়া বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ উৎপাদন সহযোগী। স্বাধীনতার পর থেকে কোরিয়া বিশেষ করে টেক্সটাইল ও অবকাঠামো খাতে সহযোগিতা করে আসছে। কোরিয়ার ব্যবসায়ীরা যাতে বাংলাদেশে বিনিয়োগে এগিয়ে আসেন, সেটিই প্রেসিডেন্টের দূতকে বলা হয়েছে।

বাংলাদেশ প্রতিটি দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে নিজেদের স্বার্থে তা কাজে লাগাতে বদ্ধপরিকর। সে লক্ষ্যে বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এই স্বার্থ বিবেচনায়ই সরকার পদক্ষেপ নিচ্ছে। আমরা দেখছি, আইপিএস বা ইন্দো প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিতে বাংলাদেশের যোগদান বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক ধরনের আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, তিনি বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং সময়ের আলোকে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। এটিও বাংলাদেশের কৌশলেরই অংশ। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ বিআরআইএর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। সুতরাং সার্বিক বিবেচনায় সেভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সব শেষ বলার বিষয়, পূর্ব-পশ্চিমে বাংলাদেশের গুরুত্ব বাড়ার কারণেই বিদেশিদের সফর আমরা দেখছি। এখানে শুধু বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশের বিষয় নয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের কারণে যেসব বিষয়ে তাদের উদ্বেগ রয়েছে, সেখানে আমাদের স্বার্থ থাকলে সে বিষয়ে বাংলাদেশ নিজেই এক ধাপ এগিয়ে কাজ করছে। অন্তত প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে সেটি পরিস্কার।

– ড. দেলোয়ার হোসেন: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; প্রেষণে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সদস্য হিসেবে নিয়োজিত।

সমকালে প্রকাশিত [লিংক]