Increasing Bargaining Opportunity for Bangladesh

536

ভৌগোলিক অবস্থান এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন– এ দুটো কারণে বাংলাদেশের গুরুত্ব বহির্বিশ্বে বাড়ছে। নিকট অতীতেই ডোনাল্ড লুর সফর থেকে পশ্চিমের সঙ্গে আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উন্নতির বিষয়ে আশাবাদী হয়েছিলাম এবং তখনও প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ বিষয়টি নিয়ে লিখেছিলাম। সাম্প্রতিক এ তিনটি সফরই যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের গুরুত্বের বিষয়টি প্রমাণ করে তা কিন্তু নয়। কিছুদিন আগে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হযরত শাহজালাল (র.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কিছু সময় অবস্থানেরও কূটনৈতিক তাৎপর্য আছে। এ কটি দেশ বাদে রাশিয়া, জাপান এবং অন্য পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো আমাদের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ইতোমধ্যে আমাদের যোগাযোগ বেড়েছে। তাই এক দিনে তিন কূটনীতিকের গুরুত্বপূর্ণ সফরের কারণেই বাংলাদেশের গুরুত্ব অনেক বেড়েছে, এমন ভাবলে ভুল হবে। এ সফরের আগেও নানা সময়ে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব আমরা যেমন অনুধাবন করছি, তার চেয়ে বেশি অনুধাবন করতে পারছে বহির্বিশ্ব।

বিগত এক দশকে বিশ্বরাজনীতির আমূল পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমানে বিশ্ব এক সংকটময় মুহূর্ত পার করছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ গোটা বিশ্বকে নতুন মেরুকরণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কারণ এ যুদ্ধ কেন্দ্র করে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর বৈরিতা বা টানাপড়েন ক্রমেই স্ফীত হচ্ছে। অন্যদিকে চীনের সঙ্গেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ব্যাপক হলেও নিরাপত্তা ও কৌশলগত দিক থেকে দুটি দেশের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। একই সময়ে চীন ও ভারতের মধ্যেও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি আমরা লক্ষ করছি। অর্থাৎ বৃহৎ এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সম্পর্কের অবনতিও বৈশ্বিক সংকট পোক্ত করে চলেছে। সম্পর্কের অবনতি ঘটায় এসব শক্তি স্বার্থের হিসাবনিকাশ এবং পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার জন্য অনেক কিছুই নতুন করে মূল্যায়নের চেষ্টা করছে। এমন পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক শক্তিমত্তার বিবেচনায় বাংলাদেশের গুরুত্ব স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে।

বিগত এক দশকে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরের দেশগুলো অর্থনৈতিক সূচকে উন্নতি করেছে। বিশেষত ওবামার শাসনামলে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো কূটনৈতিক ভূমিকা বাড়াতে নানামুখী পদক্ষেপ নেয়। বিশ্বরাজনীতিতে ক্ষমতার কাঠামোও ওই সময় থেকে পরিবর্তিত হতে হতে বর্তমানে পরিণত রূপ নিচ্ছে। এজন্য বৃহৎ শক্তি বাদেও মাঝারি শক্তিগুলোও বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, ইন্দোনেশিয়া এবং সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার কূটনৈতিক তৎপরতা দেখতে পাচ্ছি। এই পরিপ্রেক্ষিতে ১৫ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রপতির বিশেষ দূত জাং সঙ মিন দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক পর্যায়ে যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়ে জোর দিয়েছেন, যাতে আরও সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়। এ রকম প্রতিটি সফরেই দ্বিপক্ষীয় উদ্দেশ্যের বিষয়টি মুখ্য বলে বিবেচিত হয়।

ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিনয় মোহন কোয়াত্রার সঙ্গে আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বৈঠকটিও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জি-২০-এর বর্তমান সভাপতি ভারত। আমরা জানি, বর্তমান বিশ্ববাস্তবতায় জি-২০ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। পূর্ব-পশ্চিম দুই প্রান্তেরই গুরুত্বপূর্ণ শক্তিগুলো এ জোটের অংশীদার। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে ভারতের সভাপতিত্বে জি-২০-এর শীর্ষ সম্মেলন হবে। এ সম্মেলনে বিশ্বের নয়টি গুরুত্বপূর্ণ উদীয়মান অর্থনীতির দেশকে ভারত আমন্ত্রণ জানিয়েছে, যার মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে। এ আমন্ত্রণই আনুষ্ঠানিকভাবে জানাতে এসেছিলেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব। পাশাপাশি জ্বালানি, যোগাযোগ অবকাঠামো, বাণিজ্য এমনকি পানি বণ্টন বিষয়ক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। গত এক যুগে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে বিভিন্ন টানাপড়েনের মীমাংসা হওয়ায় দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক একটি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বিনয় মোহন কোয়াত্রা সম্প্রতি পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছেন এবং দায়িত্ব প্রাপ্তির পর এটিই তার প্রথম সফর। সেদিক থেকেও এ বৈঠকটি তাৎপর্যপূর্ণ।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ উপদেষ্টা ডেরেক শোলের সফরটিও নানা দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের ব্যাপকতা অনেক। এই বৃহৎ শক্তির সঙ্গে আমাদের বিশাল বাণিজ্যিক, নিরাপত্তা সংলাপ, দ্বিপক্ষীয় নানান চুক্তি এমনকি রোহিঙ্গা ইস্যুতে সমঝোতার বিষয়ও সম্পর্কিত রয়েছে। এর পরও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে আমাদের কিছু মতবিরোধ আছে। এসব মতবিরোধ সমাধানে বাংলাদেশের প্রতি দেশটির স্বাভাবিকভাবেই আগ্রহ তৈরি হয়েছে। কারণ এ ভূখণ্ডে বিশেষত বঙ্গোপসাগর উপকূলে দেশটির মিত্ররাষ্ট্র ভারত এবং আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো অবস্থিত। কিন্তু স্বার্থোদ্ধারের জন্য ভারত ও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের নানান পন্থা অবলম্বন এবং ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি অনুসরণ করে নিজেদের শক্তি বৃদ্ধির চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে বিভিন্ন সময় ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও বিদ্যমান সংকট নিরসনে দৃশ্যমান অগ্রগতি মেলেনি। নানা মহলে সংগত কারণে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, ভূরাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশের গুরুত্ব বাড়লে এ সমস্যার সমাধান হচ্ছে না কেন। মনে রাখতে হবে, রোহিঙ্গা ইস্যুটি জটিল। এ সমস্যা নিরসনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশের পদক্ষেপ থাকলেও তা যথেষ্ট নয়। কারণ এ বিষয়ে মিয়ানমারের অসহযোগিতা এতটাই তীব্র যে, কোনো পদক্ষেপই ফলপ্রসূ হচ্ছে না। আবার যে দেশগুলো রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আমাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা চালাচ্ছে, তাদের মধ্যেও এক ধরনের স্ববিরোধিতা দেখা যায়।

তবে আশার কথা, যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি রোহিঙ্গা গণহত্যাকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং রোহিঙ্গাদের যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন প্রক্রিয়ার বিষয়েও তৎপর হয়েছে। ডেরেক শোলের বক্তব্যেও এ কথা স্পষ্ট। রোহিঙ্গা ইস্যুতে অতীতের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ অনেকাংশে বেড়েছে। তার পরও এ বিষয়ে মিয়ানমারের অবস্থান টলানো যায়নি। চীন ও ভারতের সরাসরি সমর্থন পাওয়ায় রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে তারা শক্ত অবস্থান নিতে পারছে না। মূলত বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে বিভক্তি এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর তৎপরতার অভাবে এ সমস্যার সমাধান করা যাচ্ছে না। লক্ষণীয়, মিয়ানমারে এখন ক্ষমতায় জান্তা সরকার এবং তারা প্রতিনিয়ত মানুষ মারছে। কিন্তু দেশটির অভ্যন্তরে রোহিঙ্গাদের পক্ষে সহানুভূতিশীল শক্তিশালী নাগরিক গোষ্ঠীর সোচ্চার ভূমিকা দৃশ্যমান নয়। শুধু তাই নয়, জান্তা সরকারও তাদের ক্ষমতা স্থায়ী করার লক্ষ্য রাখায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি নিতে নারাজ। আপাতত বাংলাদেশের বন্ধুরাষ্ট্র কিংবা উন্নয়ন সহযোগীরা অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থেই এ সমস্যা সমাধানে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না এবং এটি একটি ‘অনন্য’ সংকট হিসেবে রয়ে গেছে। বাংলাদেশ এ সমস্যা সমাধানে প্রতিনিয়ত কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে। তবে এ সমস্যা সমাধান একমাত্র মিয়ানমারই করতে পারে।

বিশ্ব রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ক্ষমতার কাঠামো প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে। আর এ পালাবদলে নতুন সুযোগও তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশের মতোই অনেক উদীয়মান অর্থনীতি বিরুদ্ধ দুই শক্তির সঙ্গেই সদ্ভাব বজায় রাখতে পারছে, যেমন ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইন। বিশ্ব কূটনীতিতে একদিকে ভারসাম্য বজায় রাখা এবং অন্যদিকে স্বকীয় সত্তা ধরে রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সফলতা দেখাচ্ছে। বৈশ্বিক মেরুকরণের সময়ে বাংলাদেশ সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। কিন্তু দ্রুত পরিবর্তনশীল এ বিশ্বে তাল মিলিয়ে চলার জন্য প্রেক্ষাপট অনুধাবন করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ পরিবর্তন সাপেক্ষে বৃহৎ শক্তিগুলোর স্বার্থ ও আচরণে নানান পরিবর্তন ঘটে। এ সুযোগে বাংলাদেশের মতো উদীয়মান রাষ্ট্রগুলোও সম্পর্কোন্নয়নে কূটনৈতিক তৎপরতা চালায়। ফলে বাংলাদেশ কূটনৈতিক প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হচ্ছে। প্রতিযোগিতার এই জায়গাটি বোঝার জন্য আমাদের কৌশলগত গবেষণার পরিমাণ বাড়িয়ে প্রতিটি বিষয়ের চুলচেরা বিশ্লেষণ করার পাশাপাশি প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে।বৈশ্বিক মেরুকরণের এ সময়ে কূটনৈতিক তৎপরতায় আমাদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। চাপের মুখে ভুল সিদ্ধান্ত না নেওয়ার ব্যাপারেও সজাগ হতে হবে।

আমাদের সুযোগ বাড়ছে এ বিষয়ে কৌশলী ও আত্মবিশ্বাসী হওয়ার। তবে দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস কূটনীতির শীর্ষ পর্যায়ে থাকলে চলবে না। অন্তত মধ্যম পর্যায় এবং তার নিচের স্তরেও এই সক্ষমতা বাড়াতে হবে। অতীতে আমরা নিজেদের দুর্বল কিংবা নির্ভরশীল পক্ষ ভাবতাম। এখন আমাদের দরকষাকষির একটি জায়গা তৈরি হয়েছে। একে কাজে লাগাতে হবে। বহুমেরুকেন্দ্রিক বাস্তবতার মধ্যে যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হয়েছে, তা অনুধাবন করে সুযোগ কাজে লাগানোর আত্মবিশ্বাস বাড়াতে হবে। আপাতত স্বকীয়তা প্রদর্শন করে বিশ্বের সব দেশের সঙ্গেই আমরা কৌশলগত এবং জাতীয় স্বার্থ প্রসঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখতে পারছি। ভবিষ্যতে যেন কোনো পক্ষের কাছে আমরা বিরুদ্ধপক্ষ হয়ে না উঠি, সেদিকে বিশেষ মনোযোগ রাখা জরুরি।

– ড. দেলোয়ার হোসেন: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; প্রেষণে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সদস্য হিসেবে নিয়োজিত।

প্রতিদিনের বাংলাদেশে প্রকাশিত [লিংক]