Impact of International Events on Politics of Bangladesh

325

জার্মান চ্যান্সেলর অটো ভন বিসমার্ক পররাষ্ট্রনীতিকে সংজ্ঞায়িত করার জন্য বলেছেন যে, পররাষ্ট্রনীতি হচ্ছে একটি দেশের অভ্যন্তরীণ নীতির একটি সম্প্রসারিত রূপ। সেদিক থেকে পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা, অভ্যন্তরীণ নীতিকেন্দ্রিক ঘটনাগুলোর সম্পর্ক নিয়ে শত বছর ধরে গবেষণা হচ্ছে। তার এ ধারণা আধুনিককালেও বেশ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয়। এ সম্পর্ক নিয়ে আরও বিস্তৃত তাত্ত্বিক আলোচনা রয়েছে। এ রকমই আরেকটি ধারণা হচ্ছে ফার্স্ট ইমেজ ও সেকেন্ড ইমেজের মধ্যে সম্পর্ক। একটি দেশের অভ্যন্তরীণ যে বাস্তবতা সেটিকে ফার্স্ট ইমেজ বলা হয়। আর অভ্যন্তরীণ স্তরের বাইরের আলোচিত বিষয়কে সেকেন্ড ইমেজ হিসাবে দেখা হয়। এ বিতর্ক আন্তর্জাতিক সম্পর্কে আছে যে ফার্স্ট ইমেজ কি সেকেন্ড ইমেজকে প্রভাবিত করে নাকি সেকেন্ড ইমেজ ফার্স্ট ইমেজকে প্রভাবিত করে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক ঘটনাবলি অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে প্রভাবিত করে নাকি অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক ঘটনাগুলোকে প্রভাবিত করে। ফলে এ সম্পর্ক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা দেখা যাচ্ছে যে বর্তমান বিশ্ব অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি আন্তঃনির্ভরশীল এবং পারস্পরিকভাবে যুক্ত। একে অবশ্য মোটাদাগে বিশ্বায়ন বলা হয়ে থাকে। রাজনীতি, অর্থনীতি, পরিবেশ, সংস্কৃতি ও নিরাপত্তাসহ সবকিছুই এখন বিশ্বায়নের আওতাভুক্ত। এ বিষয়গুলো নিয়ে বিভিন্ন দেশ, জনগণ ও প্রতিষ্ঠান যেই মহাদেশেরই হোক না কেন বা যেই দেশের সঙ্গেই সংযুক্ত থাকুক না কেন, তাদের মাঝে যোগাযোগ নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, মিথস্ক্রিয়া বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহ ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতা-অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও এর যে কোনো পরিবর্তনের ওপর একটা প্রভাব বিস্তার করে এবং বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দেশে এর উদাহরণ দেখা যায়।

স্নায়ুযুদ্ধের সময় দেখা যায় যে, যুদ্ধের বাস্তবতা অর্থাৎ দ্বিমেরুকেন্দ্রিক বিশ্ব অর্থাৎ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই পরাশক্তির যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও বৈরিতা এবং বিভিন্ন সময় সহযোগিতা-তখনকার সময় তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছে এবং অর্থনীতিকে করেছে নিয়ন্ত্রণ। একইভাবে বর্তমান যে বিশ্ব সেখানেও দেখা যায় যে আন্তর্জাতিক ঘটনাগুলো আগের চেয়ে আরও বেশি অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ওপর প্রভাব বিস্তার করে। এবং এটি একদিকে যেমন, একটি বাস্তবতা, অন্যদিকে বাংলাদেশের নেতৃত্ব অভ্যন্তরীণ বিষয়ও আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিষয়গুলো প্রভাব বিস্তার করতে পারে।

তবে বাংলাদেশে যে ঘটনাপ্রবাহ গত কয়েকবছর ধরে, বা আরও আগে থেকেই লক্ষ করা যায় তার উদাহরণ এখানে প্রণিধানযোগ্য। বিশেষ করে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ একটি বড় উদাহরণ কেননা আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি বড় প্রভাব ছিল এ যুদ্ধের ওপরে। যে প্রভাবটি, বাংলাদেশের তৎকালীন মুজিবনগর সরকার এবং বাংলাদেশের তখনকার যারা মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে এবং বিশেষ করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেভাবে এ বিষয়গুলো অনুধাবন করতে পেরেছিলেন পঞ্চাশের দশক থেকেই বিষয়গুলোকে মাথায় রেখেই, বেশ গুরুত্বের দাবিদার। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মধ্যেও দুই পরাশক্তির বিপরীতমুখী অবস্থান দৃশ্যমান ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন বা তাদের বন্ধু রাষ্ট্রগুলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল এবং অনেকভাবে এ যুদ্ধকে ব্যর্থ করার পরিকল্পনাও হয়েছে। অপরদিকে অন্য প্রান্তে ছিল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারত। ভারত জোট নিরপেক্ষতার পাশাপাশি সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গেও যথেষ্ট ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে চলত। ফলে ভারত এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্মিলিত সমর্থনের কারণে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের যে গতি প্রকৃতি সেটিকে পরিবর্তন করার যে চেষ্টা পাকিস্তান এবং পাকিস্তানের পক্ষে যে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো ছিল-তারা করতে পারেনি। এ প্রচেষ্টা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো পর্যন্ত গড়িয়েছিল। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশের পক্ষে ভেটো দেয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু হওয়া এ অভ্যন্তরীণ ঘটনার ওপর আন্তর্জাতিক ঘটনাগুলোর ও পরিস্থিতির প্রভাব বিস্তার এখনো অবধি চলমান। মাঝে এর ভয়াবহ রূপ দেখা যায় ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের মতো ইতিহাসের জঘন্যতম নিষ্ঠুর ঘটনায় আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহের প্রভাব বিস্তারে। বিভিন্ন বিশ্লেষণে এমনটাই উঠে এসেছে।

৭০, ৮০ এবং ৯০-এর দশকেও এ প্রভাব বিস্তার থেমে থাকেনি। বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে চলা সামরিক শাসন অব্যাহত থাকার পেছনেও আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি প্রভাব লক্ষণীয়। কেননা আন্তর্জাতিক রাজনীতির সুবিধা নিয়েই দেখা যায় সামরিক শক্তিগুলো বা সামরিক সরকারগুলো তাদের শাসনকে প্রলম্বিত করে থাকে। এমনকি তাদের সঙ্গে অনেক বিশ্বশক্তির পুরোনো সম্পর্কে কোনো ফাটল দেখা যায় না। এ রকম বাস্তবতা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে দেখা যায়। ফলে এ সামরিক শাসন ও পরে গণতান্ত্রিক পথে অভিযাত্রা প্রতিষ্ঠার পরও দেখা যায় যে এ আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহ ও রাজনীতির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা অব্যাহত থেকেছে। বাংলাদেশে এক সময় কূটনৈতিকদের বিভিন্ন ক্লাব ছিল যারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো নিয়ে বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য রাখতেন। তাদের একটি চেষ্টা সব সময়ই ছিল, যে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় যারা আছেন বা যারা আসবেন তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করা। ফলে বাংলাদেশের এ অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আন্তর্জাতিক রাজনীতি বা ঘটনা প্রবাহের যে সম্পর্ক সেটি একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতা। কিন্তু এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে কখনোই সুফল বয়ে আনতে পারেনি। বরং লক্ষ করা যায় যে, এগুলো আন্তর্জাতিক রাজনীতির ভেতরের যে সমীকরণ আছে, বিভিন্ন স্বার্থের যে হিসাব-নিকাশ আছে-সে কারণেই হয়ে থাকে। পাশাপাশি দেখা যায় যে, বিশ্ব ব্যবস্থা একটি অনানুষ্ঠানিক বিষয়। যতই বলা হোক না কেন, বিশ্ব একটি একমেরুকেন্দ্রিক, দ্বিমেরুকেন্দ্রিক বা বহু মেরুকেন্দ্রিক ব্যবস্থা, কিন্তু এটি আদতে একটি খোলা প্রান্তরের মতো যেখানে বিভিন্ন দেশ তাদের স্বাধীন সার্বভৌম অবস্থান বজায় রেখে পরস্পরের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে দরকষাকষির সম্পর্ক স্থাপন করে। সেখানে তারা অর্থনীতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সহযোগিতা, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, পরিবেশ ও ভূরাজনীতিসহ অনেক বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে সম্পর্ক স্থাপন করে থাকে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির বহুল আলোচিত মূলমন্ত্র যেমন পৃথিবীতে স্থায়ী শত্রু বা মিত্র নেই, আছে শুধু স্বার্থ।

ফলে, দেশগুলোর নিজেদের স্বার্থ, নিজেদের যে দৃষ্টিভঙ্গি সেটিকে তারা তুলে ধরার চেষ্টা করেন। যার মাধ্যমে দেখা যায়, একটি আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টা। বৃহৎ শক্তির ক্ষেত্রে মূলত এটি বিশেষভাবে প্রযোজ্য। তবে অন্যান্য শক্তিগুলোও তাদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে থাকে। ফলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের ঘটনা দেখা যায়। বর্তমানেও দেখা যাচ্ছে যে, বাংলাদেশকে নিয়ে কোনো কোনো রাষ্ট্রের কূটনীতিকরা বিভিন্ন রকম ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছে যেটা এক ধরনের হস্তক্ষেপের পরিবেশ তৈরি করেছে। এখানে বলে রাখা ভালো, যদিও এটি বিশ্বায়নের যুগ, একটি আন্তঃনির্ভরশীলতা রয়েছে প্রায় সব ক্ষেত্রেই এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ (যা প্রাচীন, মধ্যযুগ ও আধুনিককালেও বিদ্যমান-যার মাত্রা হয়তো বর্তমানে বৃদ্ধি পেয়েছে কিন্তু প্রবণতা ছিল সব সময়ই)। এ যোগাযোগের মাধ্যম ছিল সাংস্কৃতিক আদান প্রদান, অর্থনৈতিক আদান প্রদান, বিভিন্ন সভ্যতার মধ্যে যোগাযোগ-এ বিষয়গুলো সব সময়ই ছিল। সঙ্গে লক্ষ করা যায় যে, নিরাপত্তার প্রয়োজনে এক দেশ অপর দেশকে সাহায্য করেছে। বিশেষ করে পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার মধ্যে দেখা যায় যে, এ ধরনের বৈশ্বিক ব্যবস্থাটাকে কোনো কোনো রাষ্ট্র বা বৃহৎ শক্তি তাদের পক্ষে নিয়ে বিশ্বে এক ধরনের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে যাচ্ছে, যদিও এ বিষয়টিও নতুন নয়। ঔপনিবেশিক শাসনামলে একেবারে সরাসরি শাসন করা হয়েছে উপনিবেশগুলোকে। এখন সরাসরি শাসন না করলেও বিশ্বব্যবস্থার যে বিভিন্ন কাঠামো আছে, বিভিন্ন নিয়ম ও নীতি আছে সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রচেষ্টা লক্ষণীয়-এ নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি চলে গিয়েছে আদতে বৃহৎ শক্তিগুলোর হাতে। সেদিক থেকে আন্তর্জাতিক ঘটনাগুলো বা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয় বাংলাদেশের ওপর প্রভাব বিস্তার করবে সেটিই স্বাভাবিক। এবং এর মাধ্যমে বাংলাদেশ যেসব সময় চাপে থাকবে বা ক্ষতি হবে সেটি নয়, বরং বাংলাদেশ এ রকম একটি অবস্থা থেকে সুবিধাও নিতে পেরেছে। বাংলাদেশের বর্তমান যে অর্থনৈতিক অগ্রগতি, বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশ যে অবস্থান তৈরি করেছে সেটিও বিশ্বায়নের আন্তঃযোগাযোগের ফসল।

তবে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জায়গা থেকে বিবেচনা করলে আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রভাব যতটাই থাকুক, এ প্রভাব কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা বিশ্বব্যবস্থার মূল যে চরিত্র, সেটি হচ্ছে সার্বভৌম ভিত্তি বা রাষ্ট্রকেন্দ্রিক ধারণা যার পেছনে রয়েছে ওয়েস্টফেলিয়ান আদর্শ। ওয়েস্টফেলিয়ান ধারণার মূল বিষয় হচ্ছে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা যাবে না এবং একটি দেশ আরেকটি দেশের সার্বভৌমত্ব বা স্বাধীনতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে-এটি বিশ্বব্যবস্থার অন্যতম রক্ষাকবচ। ফলে যখন একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্য একটি দেশ প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করবে সেটি কার্যত বিশ্বব্যবস্থার মূলে আঘাত করার শামিল। তাই এ আচরণ কখনো শুভ ফল বয়ে আনে না এবং দেখা যায় না যে কোনো দেশের রাজনীতিতে এর ফলে গুণগত পরিবর্তন হয়েছে বা কোনো ইতিবাচকতা যোগ হয়েছে। বরং সেই দেশগুলোয় নিজেদের আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাস ও রাষ্ট্র বিনির্মাণের যে ইতিহাস সেটি মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে আন্তর্জাতিক ঘটনাগুলোর ধারাবাহিক প্রভাবেও লক্ষণীয়, বিশেষ করে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে বিবেচনায় নিলে দেখা যায় যে, এটি এমন একটি অঞ্চলে অবস্থিত যেখানে একেবারে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রান্তে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ সংযুক্ত করে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াকে দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে। বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী একটি রাষ্ট্র, যা ভারত মহাসাগরের সঙ্গে বিশেষভাবে সংযুক্ত। বাংলাদেশ এমন একটি প্রান্তে অবস্থিত যার একপাশে রয়েছে ভারতের মতো শক্তি, খুব নিকটেই চীনের মতো শক্তি। আবার বাংলাদেশের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত আছে আসিয়ান দেশগুলো। ফলে বাংলাদেশের এ গুরুত্বের কারণেই বাংলাদেশকে প্রভাবিত করার এত প্রচেষ্টা। বিশেষ করে বাংলাদেশে যখন নির্বাচনের সময় সামনে থাকে, তখন এ বিষয়গুলো বেশি করে সামনে চলে আসে। পশ্চিমা দেশগুলো এসব বিষয়ে অনেক সোচ্চার হয়ে পড়ে। তবে এ কথাও ভুলে গেলে চলবে না, এ বিষয়গুলো একটি দেশের একান্তই অভ্যন্তরীণ বিষয় যা কূটনীতির অংশ নয়। এটি কোনোভাবেই বহিঃশক্তির মাধ্যমে পরিবর্তনযোগ্য নয়। অর্থনীতি, পরিবেশসহ অন্যান্য বিষয়ে আন্তর্জাতিক প্রভাবে পরিবর্তন সম্ভব হলেও রাজনীতির জায়গায় এ সুযোগ খুবই সীমিত। নিশ্চয়ই রাজনৈতিকভাবে বিভিন্ন দেশ একে অপরের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে পারে। কিন্তু এটি কোনো অবস্থাতেই কাম্য নয় যে, শক্তিগুলো তাদের স্বার্থের কারণে এখানে যা খুশি তা করতে পারে।

স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের সঙ্গে বহির্বিশ্বের বা আন্তর্জাতিক ঘটনাবলির সম্পর্ক আছে। কিন্তু সেই সম্পর্ক আন্তর্জাতিক বা বিশ্ব ব্যবস্থার অংশ হিসাবে। বাংলাদেশ যতটা স্বাধীন যতটা সার্বভৌম ততটাই সার্বভৌম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিংবা চীন বা রাশিয়া অথবা ভিয়েতনাম বা ভুটান। ফলে এ সার্বভৌমত্বের ও স্বাধীনতার যে ধারণা এবং একটি রাষ্ট্রীয় যে স্বকীয়তার ধারণা সেটিকে সমুন্নত রেখেই কিন্তু আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ঘটনাগুলো বা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বিদ্যমান থাকে। এবং এটি কখনোই একতরফা নয়। বিভিন্ন রাষ্ট্র বিভিন্নভাবে পরিচালিত হতে পারে। এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি আবহমান বাস্তবতা।

তবে গত প্রায় এক দশক ধরে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল ও এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল অথবা এসিয়ান সেঞ্চুরি-এ বিষয়গুলোতে একটা বড় রকমের পরিবর্তন ঘটেছে। বিশ্বে উন্নয়নের কথা বলি, বিশ্বে সমৃদ্ধির কথা বলি, নিরাপত্তার বিষয়গুলো অথবা সভ্যতার বিষয়-যে কোনো বিবেচনায়ই এশিয়ার একটি পুনর্জাগরণ ঘটেছে। একটা সময় এশিয়ায়ই ছিল সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র। আবার বিশ্ব সেই প্রাণকেন্দ্রেই ফিরে আসছে। ফলে এশিয়ার প্রাণকেন্দ্র হিসাবে আবির্ভূত হওয়ার যে বাস্তবতা, সেই বাস্তবতায় বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আছে এবং সে কারণে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো বিশ্ব অনেক সূক্ষ্মভাবে নজরে রাখছে। সেখানে একদিকে যেমন পশ্চিম আছে, অন্যদিকে চীন আছে, রাশিয়া আছে, সেখানে ভারত আছে, জাপান আছে, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন আছে, যুক্তরাজ্য আছে-ফলে সবারই আগ্রহ যে বাংলাদেশ কী করছে? বাংলাদেশ যেহেতু মিয়ানমারের মতো কোনো বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র কিংবা ষাট বছরব্যাপী কোনো সামরিক জান্তাশাসিত রাষ্ট্র নয় বরং বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্য দিয়ে বিকশিত হচ্ছে ফলে এ ধরনের পরিবর্তন বা এ ধরনের বাস্তবতার সঙ্গে বাংলাদেশের একটা সম্পর্ক থাকবেই। তবে নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহ শুধু বাংলাদেশেই প্রভাব বিস্তার করছে না বরং বাংলাদেশও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের ঘটনা প্রবাহে ভূমিকা রাখছে, প্রভাব বিস্তার করছে। এখানে উল্লেখ করা যায়, বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের অবদান, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব রুখতে বাংলাদেশের ভূমিকা, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে কীভাবে সামনে নিয়ে আসতে হয় সে উন্নয়নের মডেল বাস্তবায়নে বাংলাদেশের অবস্থান, নারীর ক্ষমতায়ন-ফলে শুধু বাংলাদেশ প্রভাবিত হচ্ছে না বরং বাংলাদেশ অন্যকেও প্রভাবিত করছে। বর্তমান বিশ্বে ফার্স্ট ইমেজ ও সেকেন্ড ইমেজ পরস্পর পরস্পরকে নিবিড়ভাবে প্রভাবিত করছে এবং এটি একতরফা কোনো বিষয় নয়, এটি সব সময়ই একটি গতিশীল ও বহুমুখী প্রক্রিয়া।

– ড. দেলোয়ার হোসেন: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; প্রেষণে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সদস্য হিসেবে নিয়োজিত।

যুগান্তরে প্রকাশিত [লিংক]