Lu’s Visit Injects New Momentum in Bilateral Relations

276

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ডোনাল্ড লুর সফর ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এ সফর নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। আমরা দেখেছি, প্রায় একই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দু’জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বাংলাদেশ সফরে এসেছেন। প্রথমে এসেছেন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ পরিচালক রিয়ার অ্যাডমিরাল এইলিন লাউবেখার। আবার ২০ জানুয়ারি আসছেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষ র‌্যাপোর্টিয়ার ফিলিপ গঞ্জালেজ। তবে আমেরিকা ও বাংলাদেশের মধ্যে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটনা ঘটে; ডোনাল্ড লুর দুই দিনের সফরে সেখান থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার বার্তা স্পষ্ট।

বলার অপেক্ষা রাখে না, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। মহান মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭২ সালের ৪ এপ্রিল বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে দেশটির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় যে সম্পর্ক শুরু হয়, তা পাঁচ দশকের অধিককালে নানা মাত্রা লাভ করে। ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু ওয়াশিংটন সফর করেন। এরপর প্রায় প্রতিটি সরকারের সময়েই সম্পর্ক এগিয়েছে। বৈদেশিক সাহায্য, অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছাপিয়ে যুক্তরাষ্ট্র একসময় বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির বৃহত্তম বাজারে পরিণত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের আরেকটি দিক হলো, সেখানে অনেক বাংলাদেশি বাস করেন এবং রেমিট্যান্স প্রাপ্তির দিক থেকেও এক নম্বরে উঠে এসেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) আমেরিকায় বসবাসকারী প্রবাসীরা ১৯৬ কোটি ৬৭ লাখ (১.৯৭ বিলিয়ন) ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। আর সৌদি আরব থেকে এসেছে ১৯০ কোটি ৯১ লাখ (১.৯১ বিলিয়ন) ডলার। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বিস্তৃত হয়ে নিরাপত্তা ও কৌশলগত দিকেও তা প্রসারিত হয়েছে। সে জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই নয়, বিশ্বের অন্যান্য পরাশক্তির কাছেও বাংলাদেশের অবস্থান এখন গুরুত্বপূর্ণ। সে জন্যই আমাদের এখানে বিদেশি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের সফর আগের তুলনায় বেড়ে গেছে। আমেরিকা তার এশীয় নীতির কারণে এবং ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজির (আইপিএস) কারণেও ঢাকার বিষয়ে মনোযোগী। তা ছাড়া দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসা এবং ধারাবাহিক উন্নয়নের কারণেও যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেকের ঢাকার প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রয়েছে।

কিন্তু ডোনাল্ড লু এমন সময়ে ঢাকা সফরে এসেছেন, যখন দুই দেশের সম্পর্কে আপাতদৃষ্টিতে কিছুটা টানাপোড়েন লক্ষ্য করা গেছে। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র র‌্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। অনেক আগে থেকেই দেশটি নির্বাচনসহ আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নানাবিধ মন্তব্য করে আসছে। এর আগে দেশটি জিএসপি সুবিধা স্থগিত করায় পণ্যের বাজারে উদ্বেগ তৈরি হয়। সম্প্রতি নির্বাচনসহ নানা বিষয়ে তাদের মন্তব্য কিছুটা হলেও অপ্রীতিকর সংকট তৈরি করে। যে সময়ে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক শক্তিশালী হতে পারত, সেখানে কিছু অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতি তৈরির পেছনে বাংলাদেশের দায় আমরা দেখছি না। এমন নয় যে, বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতি থেকে সরে গেছে। সবার সঙ্গে সম্পর্ক রাখার নীতিতে বাংলাদেশ অটল থাকার পরও সম্পর্ক টানাপোড়েনের ক্ষেত্রে দায় সংশ্নিষ্ট দেশেরই। মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ বিশ্বের শক্তিধর কোনো দেশের প্রতি বিশেষভাবে ঝুঁকে পড়েনি, যে কারণে কারও সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হবে।

তবে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের মধ্যে যে কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে, সেখান থেকে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ডোনাল্ড লুর সফর ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছে। এ ছাড়া আরেকটি ইতিবাচক দিক উল্লেখযোগ্য। সম্প্রতি হোয়াইট হাউসে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ ইমরানের পরিচয়পত্র গ্রহণকালে স্বয়ং প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। বাইডেন বলেছেন, দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক সম্প্রসারণে মার্কিন প্রশাসন তাঁর সঙ্গে কাজ করার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। তিনি গত ৫০ বছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ‘একটি অসাধারণ গল্প’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জলবায়ু পরিবর্তন, মানবিক, উদ্বাস্তু, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা, সন্ত্রাস দমন, সামুদ্রিকসহ অন্যান্য নিরাপত্তা ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

জো বাইডেনের ওই ইতিবাচক মন্তব্যের পর আমরা ডোনাল্ড লুর সফরেও সেই ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করছি। দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো চাপ সৃষ্টি করেছিল, সেখানেও বাংলাদেশের গুণগত উন্নতির বিষয়টি এসেছে ডোনাল্ড লুর বক্তব্যে। র‌্যাবের বিষয়ে তিনি বলেছেন, র‌্যাবের বিচারবহির্ভূত হত্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে, যা বেশ অসাধারণ অগ্রগতি। এর মাধ্যমে এটিই প্রমাণ হয়, র‌্যাব মানবাধিকারকে সম্মান করে জঙ্গিবাদ দমন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করতে পারে। শ্রম অধিকার বিষয়েও বাংলাদেশের অগ্রগতির বিষয়টি ডোনাল্ড লু স্বীকার করেছেন। জিএসপি সুবিধারও ইতিবাচক বার্তা এসেছে তাঁর পক্ষ থেকে। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন, যখনই জিএসপি দেওয়ার অনুমোদন আসবে, বাংলাদেশ সেই তালিকায় সর্বপ্রথম এ সুবিধা পাবে। আইপিএস নিয়ে বাংলাদেশ যে সতর্ক, সেটাও তাঁর বক্তব্যে অস্পষ্ট নয়। ডোনাল্ড লু বলেছেন, এটি একটি কৌশল। কোনো ক্লাব নয় যে যোগদানের বিষয় আসছে। যুক্তরাষ্ট্র আইপিএসে আরও সম্পদ ও মনোযোগ দিতে চায়, সেই সঙ্গে বাংলাদেশেও। জো বাইডেন রাষ্ট্রদূত ইমরানের সঙ্গে যেমন রোহিঙ্গাদের বিষয় উল্লেখ করেছেন, তেমনি ডোনাল্ড লুও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েছেন। তাদের প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসনের বিষয়েও যুক্তরাষ্ট্র তার সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।

বাংলাদেশের কূটনৈতিক পেশাদারিত্বের কারণেই বিশ্বে আমাদের সম্পর্ক নতুন মাত্রা পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক তার বাইরে নয়। যুক্তরাষ্ট্র ভালো করেই জানে, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে এবং এ অঞ্চলে তার স্বীয় স্বার্থেই বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন করতে হবে। সে জন্যই সম্পর্কের ক্ষেত্রে যাবতীয় বাধা দূর করতে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই সচেষ্ট। বাংলাদেশ সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি সামরিক শক্তিও বৃদ্ধি করেছে। মিলিটারি পাওয়ার ইনডেক্সে এখন বাংলাদেশের অবস্থান ৪০তম। সেদিক থেকেও বাংলাদেশ তার গুরুত্ব বাড়াতে সচেষ্ট হয়েছে। সে জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের বিষয়টি চীন, ভারত, রাশিয়া তথা অন্যান্য পরাশক্তিও পর্যবেক্ষণ করবে। তবে এখানে উদ্বেগের কারণ নেই এ কারণে যে, বাংলাদেশ তার সফল কূটনীতির কারণে সবার সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে।

সেদিক থেকে ডোনাল্ড লুর সফর কেবল বাংলাদেশের জন্যই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছে। মাঝের টানাপোড়েনের উত্তরণ ঘটিয়ে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে নতুন যে মাত্রা এসেছে, তা কাজে লাগিয়ে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ ও কূটনৈতিক পেশাদারিত্ব বজায় রাখা হলে উভয় দেশই তাতে উপকৃত হবে।

– ড. দেলোয়ার হোসেন: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; প্রেষণে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সদস্য হিসেবে নিয়োজিত।

সমকালে প্রকাশিত [লিংক]