Significance of the Visit of the US Assistant Secretary for the Rohingya Issue

256

মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের জনসংখ্যা, অভিবাসন ও শরণার্থীবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলিয়েটা ভ্যাল্স নয়েস অতিসম্প্রতি পাঁচদিনের সফরে বাংলাদেশে এসেছিলেন। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগণকে সহায়তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকার তুলে ধরতে তিনি ২ থেকে ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে অবস্থান করেন। সফরকালে তিনি রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন, আশ্রয় শিবিরের পরিবেশ ও নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ, অভিবাসন বিষয়ে বাংলাদেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ, বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক সহযোগী সংগঠনগুলোর কর্মকর্তাদের সঙ্গেও দেখা করেন। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের ভাষ্য অনুযায়ী, নয়েসের সফরের উদ্দেশ্য ছিল মানবিক ও কূটনৈতিক সহায়তার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা এবং মর্যাদার সঙ্গে তাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করা। উল্লেখ্য, রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট নিরসনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা দিয়ে আসছে। বিশেষ করে আমরা জানি, শরণার্থী বিষয়ে বাইডেন প্রশাসন বেশ সোচ্চার এবং শরণার্থী সংকটের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কাজ করে যাচ্ছে।

আমরা জানি, মিয়ানমারের জান্তা বাহিনীর অত্যাচার ও গণহত্যার শিকার হয়ে ২০১৭ সালের আগস্টের পর থেকে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে আসে। বাংলাদেশ মানবিক দিক বিবেচনায় তাদের আশ্রয় দিয়েছে। এখন এটি ক্রমেই জটিল সংকটে রূপান্তরিত হচ্ছে। একদিকে প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে মিয়ানমারের জান্তা সরকারের অনীহা এবং অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান শরণার্থীর ফলে সংকট প্রলম্বিত হচ্ছে। ফলে রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। এটি এখন নিশ্চিতভাবেই প্রতীয়মান-অতিসত্বর এ সংকটের সমাধানের কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না এবং এটি দীর্ঘায়িত হবে। তাই এ সংকট নিরসনে বাংলাদেশ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। শরণার্থীদের আশ্রয়ের ব্যয় নির্বাহে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে অর্থনৈতিক সহায়তা লাভ, রোহিঙ্গাদের ওপর পরিচালিত গণহত্যার বিচারের জন্য আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা এবং মর্যাদার সঙ্গে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসনে কূটনৈতিক সহযোগিতা অর্জনের প্রয়াস বজায় রাখতে বাংলাদেশ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

এ প্রেক্ষাপটে নয়েসের সফরটি অত্যন্ত তাৎপর্য বহন করে। মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলিয়েটা ভ্যাল্স নয়েসের সফরটি কয়েকটি দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, কূটনৈতিক দিক থেকে এ সফরটি ব্যাপক তাৎপর্যপূর্ণ। নয়েস তার বক্তব্যে বেশ জোরালোভাবে বলেছেন, বিশ্বকে ভুলে গেলে চলবে না যে, এ রোহিঙ্গা সংকটের ফলে সৃষ্ট চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার দায়িত্ব শুধু বাংলাদেশের নয়; বরং বৈশ্বিক সম্প্রদায়ের উচিত এর বোঝা বহন করা এবং সংকট নিরসনে কাজ করা। তিনি এর মাধ্যমে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সমন্বিত পদক্ষেপের কথা বলেছেন। এ বছরের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সংস্থাবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিশেল জে সিসনের ঢাকা সফর এবং একই মাসে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার মিশেল ব্যাশেলেটের সফরের পর নয়েসের এ সফর আলাদা কূটনৈতিক তাৎপর্য বহন করে। গত পাঁচ মাসের ব্যবধানে উচ্চপর্যায়ের তিনজন প্রতিনিধির বাংলাদেশ সফর এবং রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে তাদের প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশের রোহিঙ্গা কূটনীতির ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অধিকন্তু, উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের সফর জান্তা সরকারের ওপর এক ধরনের কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ব্যয় নির্বাহে যে তহবিল প্রয়োজন, সেটির বিবেচনায় নয়েসের এ সফরটি গুরুত্বপূর্ণ। রোহিঙ্গা সংকটের সূচনালগ্ন থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং দাতা সংস্থাগুলো অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়ে আসছে। ২০১৭ সালের আগস্টের পর থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ১.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তা দিয়েছে। নয়েসের সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের চলমান তহবিল সহায়তা বজায় রাখার আশ্বাস দেওয়া। কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে গিয়ে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে নয়েস বলেছেন, অর্থনৈতিক সহায়তা চলমান থাকবে এবং তারা তাদের সহায়তা বাড়াবে। নয়েসের এ আশ্বাস ঠিক তখনই এলো, যখন ক্রমবর্ধমান শরণার্থী সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে এবং তহবিল প্রবাহ বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। অধিকন্তু, ক্যাম্পের সার্বিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের তদারকি এবং সরকারি-বেসরকারি দাতা সংস্থার সঙ্গে তার আলোচনা এক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। নয়েস আশ্রয় শিবিরের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, ত্রাণ ও চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র পরিদর্শন করেন।

তৃতীয়ত, মানবিক কূটনীতির বিবেচনায় এ সফর অনন্য গুরুত্ব বহন করে। ৫ ডিসেম্বর নয়েস রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবির পরিদর্শনকালে ১০-১৫ জন রোহিঙ্গা নারী-পুরুষের সঙ্গে কথা বলেন, তাদের অভিজ্ঞতা শোনেন। এ সময় রোহিঙ্গারা তাদের ওপর সংঘটিত গণহত্যা এবং অন্যান্য নিপীড়নের বর্ণনা দেন। এ ছাড়া তিনি নিহত রোহিঙ্গা নেতা মুহিব উল্লাহর পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন এবং তাদের খোঁজখবর নেন। নয়েসের এ তৎপরতা প্রমাণ করে, মানবতা ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের জান্তা সরকারকে কোনো ধরনের ছাড় দেবে না এবং তারা রোহিঙ্গাদের ওপর পরিচালিত গণহত্যার বিচারের ব্যাপারে সদা সোচ্চার। মানবিক সেবায় যুক্তরাষ্ট্র রোহিঙ্গাদের পাশে থাকবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। ইতোমধ্যে বাইডেন প্রশাসন মিয়ানমারের সেনাবাহিনী কর্তৃক রোহিঙ্গাদের ওপর পরিচালিত নৃশংসতাকে গণহত্যা হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং এর সঙ্গে যুক্ত জান্তা বাহিনীর কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। সম্প্রতি দেশটি ঘোষণা দিয়েছে, সমগ্র বিশ্ব থেকে প্রতিবছর ১ লাখ ২৫ হাজারের মতো শরণার্থীকে তাদের দেশে পুনর্বাসন করা হবে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেনের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় নয়েস আশ্বস্ত করেছেন, মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া কয়েক লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর মধ্যে কিছুসংখ্যককে যুক্তরাষ্ট্র পুনর্বাসন করবে। নয়েস বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে শরণার্থীদের পুনর্বাসন বাড়ানো বাইডেন প্রশাসনের অগ্রাধিকার। অন্য যেসব সরকার ও অংশীদার রাষ্ট্রের সঙ্গে আমরা এ বিষয়ে আলোচনা করছি, এটি তাদেরও অগ্রাধিকার।’ গণহত্যার স্বীকৃতি প্রদান, হত্যাকাণ্ডে যুক্ত জান্তা বাহিনীর কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের উপর্যুপরি বাংলাদেশ সফর মানবিক কূটনীতিরই প্রতিফলন। নয়েসের সফর এ মানবিক কূটনীতিকে আরও জোরালো ও বেগবান করেছে।

চতুর্থত, প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে এ সফর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। নয়েস তার সফরকালে প্রত্যাবাসনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘দীর্ঘায়িত হওয়া রোহিঙ্গা সংকটের গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হচ্ছে তাদের নিরাপদে, স্বেচ্ছায় ও সম্মানজনকভাবে নিজ দেশে ফেরানো এবং তা হতে হবে টেকসই। এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও যুক্তরাষ্ট্র সবাই চায়।’ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব প্রচেষ্টা ছাড়াও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘায়িত রোহিঙ্গা সংকটের সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি উদ্বুদ্ধ করতে আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাজ করে যাব। কাজ করব, যাতে নিরাপদে নিজ দেশে ফেরার আগে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জন্য অন্য সমাধান খুঁজে পাওয়া যায়।’ এ ছাড়া রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবির পরিদর্শনকালে মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, মর্যাদার সঙ্গে তাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সার্বিক দিক বিবেচনায় মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলিয়েটা ভ্যালস নয়েসের বাংলাদেশ সফর ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কূটনৈতিক সহযোগিতা প্রদান, অর্থনৈতিক সহায়তা বজায় রাখার পূর্ণ আশ্বাস, রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার নিশ্চিতকরণ ও প্রত্যাবাসনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতির বার্তা নিয়ে এসেছিলেন নয়েস। অধিকন্তু, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এ সফর ব্যাপক গুরুত্ব বহন করে। কয়েক মাসের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তাদের পর্যায়ক্রমিক বাংলাদেশ সফর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ। এ অবস্থায় বাংলাদেশের করণীয় হলো, এসব সহায়তা কাজে লাগাতে জোরালো কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা এবং রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা পেতে মানবাধিকার এবং রোহিঙ্গা কূটনীতির তৎপরতা আরও বেগবান করা। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে এটি জোরালোভাবে তুলে ধরা যে, রোহিঙ্গা সংকটের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার দায়িত্ব শুধু বাংলাদেশের নয়, বরং বিশ্ব সম্প্রদায়ের উচিত এ দীর্ঘায়িত শরণার্থী সংকট সমাধানে সমন্বিত রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নিয়ে এগিয়ে আসা। এ সফরকে আলাদাভাবে দেখার কোনো অবকাশ নেই। শীর্ষ সফরের মাধ্যমে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক গুরুত্ববহ বিষয় আলোচনার বাইরেও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বাস্তবতায়ও এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

– ড. দেলোয়ার হোসেন: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; প্রেষণে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সদস্য হিসেবে নিয়োজিত।

যুগান্তরে প্রকাশিত [লিংক]