Foreign Assistance, ‘Debt Trap’ and Development Debate

0
326

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তির পর মার্শাল প্ল্যানের মাধ্যমে বৈদেশিক সাহায্য কিংবা উন্নয়ন সহায়তা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রপঞ্চ বা প্রবঞ্চনা হিসেবে আবির্ভূত হয়। বিষয়টি আন্তর্জাতিক রাজনীতি বা বিশ্বব্যবস্থায় একটি নতুন মাত্রা যুক্ত করেছিল। মার্শাল প্ল্যানের আওতায় পশ্চিম ইউরোপে ব্যাপক অর্থনৈতিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়া সূচিত হয়েছিল, যা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি কর্মসূচি হিসেবে বিবেচিত। এটি ইউরোপের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছিল। একই সঙ্গে আমরা দেখতে পায় বিশ্বব্যাপী ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলগুলোতেও সাহায্যের একটি নতুন প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই প্রক্রিয়াটির অগ্রভাগে ছিল পশ্চিমা বিশ্ব কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ব্রেটন উডসের মতো আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। যেহেতু পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অন্যতম ধারক ও বাহক হিসেবে এসব প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তাই এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পশ্চিমা দেশগুলো পুঁজিবাদী ও উদারবাদী একটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে।

পরবর্তী সময়ে স্নায়ুযুদ্ধকালে এই চেষ্টা অব্যাহত থাকে এবং ব্যাপক মাত্রা লাভ করে। ওই সময় বিশ্ব রাজনীতিতে মেরুকরণ ও বিভাজনের কারণে বৈদেশিক সাহায্য ঘিরে রাজনীতি ও কূটনীতি শুরু হয়। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা বিশ্ব পুঁজিবাদ প্রতিষ্ঠায় বৈদেশিক সাহায্যকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে থাকে। অন্যদিকে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক ব্লক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বৈদেশিক সাহায্যকে ব্যবহার করে। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কাঠামো ভিন্ন হওয়ার কারণে এই তত্ত্বের অনুসারী দেশগুলো পুঁজিবাদী ব্যবস্থার থেকে ভিন্ন একটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। মার্শাল প্ল্যানের বিপরীতে তারা কমেকন নামে একটি সাহায্য ফান্ড গঠন করে, যেখান থেকে তারা তাদের অনুসারী সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোকে অবকাঠামো, খাদ্যসহ বিভিন্ন খাতে ব্যাপক সহায়তা প্রদান করে। এভাবে বিদেশি সাহায্যের একটি দীর্ঘ ইতিহাস আমরা লক্ষ করি। বৈদেশিক সাহায্যের বিষয়টিকে আমরা যতটা মানবিকভাবেই দেখি না কেন, এটি নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কূটনীতির একটি অন্যতম অনুষঙ্গ। এই রাজনীতি ও কূটনীতিতে যে শুধু ভূরাজনৈতিক ও সামরিক শক্তির বিষয় থাকে তা না, বরং অর্থনৈতিক বিভিন্ন দিকগুলোর মাধ্যমেও সাহায্যকারী দেশগুলো তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ ও পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য পূরণে সচেষ্ট থাকে।

বৈদেশিক সাহায্যের এই প্রক্রিয়ার প্রতি অনেকের বিরোধিতাও ছিল। বিংশ শতাব্দীর ষাট ও সত্তরের দশকে বৈদেশিক সাহায্যের ওপর অনেক গবেষণা হয়েছে। অনেকে এটিকে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার একটি ফাঁদ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। স্নায়ুযুদ্ধের পরিসমাপ্তির পর পশ্চিমাদের বৈদেশিক সাহায্যের পরিমাণ অনেক হ্রাস পেয়েছিল। কারণ তখন বিশ্বে আমরা একটি নতুন বাস্তবতা লক্ষ করি, যেখানে এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চল থেকে বিভিন্ন দেশ উন্নয়নের ক্ষেত্রে সফলতা দেখায় এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় তাদের একটি জোরালো উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। তার আগেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, জাপানসহ দূরপ্রাচ্যের দেশগুলো ব্যাপক অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জন করে। দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকংসহ এই অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়নের সফলতার বিষয়টিকে টাইগার অর্থনীতি বলে অভিহিত করা হয়।

দূরপ্রাচ্য বলয়ের বাইরে চীন-ভারতও এ ক্ষেত্রে ব্যাপক সফলতা দেখায়। এর ফলে বিংশ শতাব্দীর নব্বইয়ের দশক ও একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার অনেক দেশ উন্নয়নের চূড়াতে পৌঁছাতে শুরু করে। তখন পশ্চিমা দেশগুলোর বৈদেশিক সহায়তার প্রবাহ এশিয়া ও আফ্রিকা অঞ্চল থেকে পূর্ব ইউরোপীয় অঞ্চলে যেতে শুরু করে। ফলে লক্ষ করা যায় যে ২০১০-এর পর থেকে চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তার অর্থনৈতিক উপস্থিতি বাড়ায়। বিশেষ করে আফ্রিকা ও এশিয়ায় চীনের ব্যাপক অংশগ্রহণ আমরা লক্ষ করি। এসব অঞ্চলের দেশগুলোতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও বিভিন্ন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যেটিকে অনেকে চীনের আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যম হিসেবে দেখে। এমনকি অনেকে এটিকে চীনের নব্য-উপনিবেশবাদ হিসেবেও আখ্যায়িত করেছে।

আফ্রিকায় পশ্চিমা দেশগুলো তাদের অর্থনৈতিক আধিপত্য বজায় রেখেছে দীর্ঘদিন ধরে। এই অঞ্চলে চীন তার অর্থনৈতিক উপস্থিতি শুরু করে অনেক পর এবং ২০১০-এর পর থেকে তা বাড়তে থাকে। বিভিন্ন দেশকে সহায়তার ক্ষেত্রে চীনের যে সামর্থ্য, সেটি বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি নতুন মাত্রা যুক্ত করে। আরও স্পষ্টভাবে বললে, আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে চীনের উত্থানে নতুন একটি আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এই সময়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। প্রথমত. চীন, ভারত, রাশিয়া, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকার অংশগ্রহণে ব্রিকস প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নতুন একটি শক্তিকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায়। দ্বিতীয়ত. বিশ্ব অর্থনীতিতে জি-৭-এর প্রভাবের পাশাপাশি জি-২০-এর ক্রমবর্ধমান শক্তিশালী উপস্থিতি নতুন একটি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক গোষ্ঠীর আবির্ভাবের জানান দেয়। তৃতীয়ত. সাউথ-সাউথ সহযোগিতার মাধ্যমে উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক দেশ বিশ্ব অর্থনীতিতে তাদের সফলতার সাক্ষ্য রাখে। ব্রিকসের নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ও ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের কথা উল্লেখ করা যায়। এগুলোর মাধ্যমে উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোর সামনে পশ্চিমা বিশ্বকেন্দ্রিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে নতুন বিকল্প সামনে আসে। এতে বিশ্বব্যাংক, ইউএসএআইডি, ড্যানিডা, সিডাসহ বিভিন্ন সাহায্যকারী সংস্থা একটি নতুন চাপের মধ্যে পড়ে।

উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল বিশ্বের এই উত্থান আরও শক্তিশালী হয় ২০১৩ সালে চীন কর্তৃক বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এটির সঙ্গে ৭০টির বেশি দেশ যুক্ত হয়। ফলে এ ক্ষেত্রে চীন ও ভারতের প্রভাব বাড়ে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো তাদের সামনে অর্থনৈতিক সহায়তার বিকল্প উৎস পায়। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় দর-কষাকষির নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয় এবং উন্নয়ন সহযোগিতার সহজলভ্যতাও আমরা লক্ষ করি। যার ফলে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর জন্য উন্নয়ন সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। ফলে উন্নয়ন সহযোগিতাকে কেন্দ্র করে স্নায়ুযুদ্ধকালীন যে রাজনৈতিক ও কূটনীতিক তৎপরতা লক্ষণীয় ছিল, সেটি আবার সামনে আসছে।

এখানে দেখা যায় যে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে উন্নয়নের যে গতি ও ধারার সৃষ্টি হয়েছিল, তাকে কেন্দ্র করে বিতর্ক ও প্রশ্ন তৈরি করা হয়। সেই প্রশ্ন আসে কখনো পরিবেশের নামে, কখনো মানবাধিকারের নামে, কখনোবা জলবায়ু পরিবর্তনের নামে, আবার কখনোবা কোনো বিশেষ দেশের সাহায্য গ্রহণের ক্ষেত্রে। এই ধরনের প্রশ্ন ও বিতর্ক নিঃসন্দেহে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর চাপ তৈরি করে ও উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করে। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল অনেক দেশ তাদের অর্থনৈতিক সফলতার জন্য উন্নয়ন সহযোগিতার একটি সুযোগ সৃষ্টি করেছে, যেখানে অনেক উন্নয়ন সহায়তাকারী দেশ সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসছে। এসব দেশে একসময় এককভাবে পশ্চিমা দেশগুলো উন্নয়ন সহায়তা করে এসেছে। কিন্তু উন্নয়নশীল বিশ্ব থেকে চীন ও ভারতের মতো উন্নয়ন সহায়তাকারী দেশের উত্থান বিদ্যমান উন্নয়ন সহযোগিতা ব্যবস্থায় বিতর্ক ও প্রতিযোগিতার উত্থান ঘটিয়েছে। সাম্প্রতিককালে সেই বিতর্ক আরও জটিল হয়েছে। এই প্রতিযোগিতা ও বিতর্কের অংশ হিসেবে অনেকে এটিকে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ঋণের ফাঁদ হিসেবে মন্তব্য করছে।

অথচ উন্নয়নের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে লক্ষ করা যায়, উন্নয়ন সহায়তাকারী দেশগুলোও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তাদের উন্নয়ন ঘটিয়েছে। তারাও বৈদেশিক উন্নয়ন সহায়তা নিয়ে তাদের উন্নয়ন ঘটিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলো এবং জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ অনেক দেশ মার্শাল প্ল্যান বা অন্যান উন্নয়ন সহায়তার মাধ্যমে তাদের উন্নয়ন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করেছে। সুতরাং অর্থনৈতিক উন্নয়নে বৈদেশিক সহায়তার উপস্থিতি নতুন কিছু না, বরং এটি ঐতিহাসিক ক্রমধারা। কিন্তু পরবর্তী সময়ে চীন ও ভারতের অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে যখন এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক দেশে উন্নয়নের প্রক্রিয়া শুরু করে, তখন অনেকে এটিকে ঋণের ফাঁদ ও ঋণ কূটনীতির বিশেষণে বিশেষায়িত করতে শুরু করল। উন্নয়ন সহযোগিতা যদি একটি দেশের উন্নয়নে কাজে লাগে, তাহলে সেই সহযোগিতা দেয়া এবং নেয়া উভয়ই কাম্য, হোক সেই সহযোগিতা কোনো ইউরোপের দেশ বা আফ্রিকা ও এশিয়ার দেশের, হোক সেই সহায়তা গ্রহণকারী দেশ এশিয়া, আফ্রিকা বা লাতিন আমেরিকার। রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক বিবেচনায় নিয়ে এটিকে ঘিরে বিতর্কিত করা কাম্য নয়।

বৈদেশিক সহায়তা নিয়ে রাজনীতি, কূটনীতি বা এটিকে ঘিরে বিতর্কের বিষয়টি উন্নয়নশীল বা অনুন্নত দেশগুলোর উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। অর্থনৈতিক উন্নয়নে বৈদেশিক সাহায্য প্রয়োজন। যে সহযোগিতা বিশ্বের প্রায় সব রাষ্ট্রই উন্নয়নের কোনো না কোনো পর্যায়ে গ্রহণ করেছে। সেই সহযোগিতা কখনোই শর্তহীন ছিল না, সেই সহযোগিতা কখনোই রাজনীতি বা কূটনীতি নিরপেক্ষ ছিল না। তার পরও উন্নয়ন সহযোগিতা বিভিন্ন দেশকে এগিয়ে নিয়েছে। এটিকে বিভিন্নভাবে অনেকে সমালোচনা করতে পারে। উন্নয়ন সহযোগিতাকে নিয়ে যত বিতর্কই হোক না কেন, অর্থনৈতিক উন্নয়নে এর গুরুত্ব অনস্বীকার্য এবং এটি ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত। ইউরোপের দেশগুলো থেকে শুরু করে চীন ও ভারত- সব দেশই তাদের উন্নয়নে বৈদেশিক সহায়তা গ্রহণ করেছে। ফলে এই বিতর্কের মাধ্যমে প্রকারন্তে উন্নয়নশীল দেশগুলোর উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। সুতরাং যত দ্রুত আমরা এটি অনুধাবন করতে পারব, তত দ্রুতই আমাদের জন্য মঙ্গল হবে।

– ড. দেলোয়ার হোসেন: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; প্রেষণে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সদস্য হিসেবে নিয়োজিত।

দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত [লিংক]