Will Trump Return to Power?

252

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ২০২০ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পরাজিত করে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বাইডেনের ক্ষমতার দুই বছরে রাজনৈতিক ব্যবস্থা অনুসারে সেখানে ৮ নভেম্বর মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ নির্বাচনে একদিকে ছিলেন ডেমোক্রেটিক দলের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন; তাঁর বিপরীতে ছিলেন রিপাবলিকান নেতা ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি ইতোমধ্যে ২০২৪ সালের নির্বাচনে আবারও প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য প্রার্থিতা ঘোষণা করেছেন। অর্থনৈতিক সংকটসহ নানা কারণে এ নির্বাচনের সপ্তাহখানেক আগেও ক্ষমতাসীন ডেমোক্র্যাটদের যেমন ভরাডুবি হবে বলে ভাবা হয়েছিল, বাস্তবে তেমনটি হয়নি। উচ্চকক্ষ তথা সিনেটে ডেমোক্রেটিক পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। নিম্নকক্ষ হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে রিপাবলিকানরা জয় পেয়েছে। তবে ব্যবধান সামান্য।

এ নির্বাচনকে বলা চলে বাইডেন প্রশাসনের জন্য অনেকটা গণভোটের মতো। সেখানে ডেমোক্র্যাটরা খারাপ করেনি, এটি বলাই যায়। অন্যদিকে রিপাবলিকানরা যে নাটকীয় জয় আশা করছিল, তা হয়নি। তবে জো বাইডেনের জনপ্রিয়তা হ্রাস পাওয়া ডেমোক্র্যাটদের জন্য নিঃসন্দেহে বড় ধাক্কা। ভোটের আগেই জরিপে দেখা যাচ্ছিল, তিনি ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ জনপ্রিয়তা হারিয়েছেন। এর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্টের এত অল্প সময়ে এভাবে জনপ্রিয়তা হ্রাসের রেকর্ড নেই বললেই চলে। বিশেষ করে তাঁর পূর্বসূরি ডেমোক্র্যাট প্রার্থী বারাক ওবামার অবস্থান ছিল ভিন্ন। ৪৪তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে বারাক ওবামা দু’বার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন।

বারাক ওবামার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় আসেন রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচনের আগ থেকেই ডোনাল্ড ট্রাম্প নানা বিতর্কের জন্ম দেন। এর পরও তাঁর নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে সংকীর্ণতা ও বর্ণবাদের উত্থানের বিষয়টিই প্রতিভাত। এমনকি ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নানা বিতর্কিত ভূমিকা রাখার পরও ২০২০ সালের নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থী হিসেবে যে জনপ্রিয়তা দেখাতে সক্ষম হন, সেটিও যুক্তরাষ্ট্রের সমাজের এসব পরিবর্তনের প্রমাণ। সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি। সে সময় নির্বাচনী ফল প্রত্যাখ্যান করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যের পর তাঁর কয়েক হাজার সমর্থক যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্যাপিটল হিলে আক্রমণ করে। এ হামলা যেমন যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের সংকট স্পষ্ট করেছে, তেমনি এর মাধ্যমে সেখানকার সমাজের কঠিন মেরূকরণের চিত্র সামনে নিয়ে এসেছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেখানে অন্য দেশের গণতন্ত্র নিয়ে সমালোচনা করে, সেখানে তাদের গণতন্ত্র নিয়ে সংকট দেখা দেওয়া উদ্বেগজনক বটে। বিশেষ করে আমরা দেখেছি, এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারণায়ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা গণতান্ত্রিক সংকটের বিষয়টি উল্লেখ করেন। ডেমোক্র্যাট দলও এবার এ বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রভাবক বিষয় হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের বর্ণবাদ, অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগ মুহূর্তে করা মার্কিন সংবাদমাধ্যমে সিএনএনের জরিপটি গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে উঠে এসেছিল, ৫১ শতাংশ মানুষ বলেছে- তারা কাকে ভোট দেবে সেটি নির্ভর করবে অর্থনৈতিক অবস্থা ও মুদ্রাস্ম্ফীতি কেমন তার ওপর। ১৫ শতাংশ মানুষের কাছে ভোটের ক্ষেত্রে গর্ভপাতের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ৯ শতাংশ অবশ্য ভোটের অধিকার ও স্বচ্ছতার নির্বাচনের বিষয় উল্লেখ করেছে। তা ছাড়া ভোটের ক্ষেত্রে বন্দুক নীতি বড় ফ্যাক্টর; বলেছে ৭ শতাংশ মানুষ। এর বাইরে অভিবাসী, জলবায়ু পরিবর্তন ও অপরাধ বিষয়ে উল্লেখ করেছে জরিপে অংশগ্রহণকারীর মধ্যে যথাক্রমে ৬, ৪ ও ৩ শতাংশ মানুষ। মধ্যবর্তী নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইও তার প্রত্যয়ন করছে। অর্থনীতি সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এবারের মূল্যস্ম্ফীতি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের ভোগাচ্ছে। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার সময় যে সংকট ছিল; এবারের মূল্যস্ম্ফীতি তাকেও ছাড়িয়ে গেছে।

২০২৪ সালে রিপাবলিকান প্রার্থী হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচন করা একটি বড় ঘটনা। তাঁর এবারের স্লোগান- ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যান্ড গ্লোরিয়াস এগেইন’। তবে তাঁর জেতার সমীকরণ অতটা সহজ হবে বলে মনে হয় না। এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ধারণা করা হয়েছিল, সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই রিপাবলিকানরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করবে। তেমনটি ঘটলে হয়তো বলা যেত, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। আগেই বলা হয়েছে, রিপাবলিকানরা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। নিম্নকক্ষে জিতলেও ব্যবধান সামান্য। তা ছাড়া স্পিকার যিনি হবেন, সেই ম্যাকার্থি ট্রাম্পবিরোধী বলে পরিচিত। ট্রাম্প অনুগতরা তাঁকে কতটুকু মেনে চলবেন- ইতোমধ্যে সে প্রশ্ন উঠেছে। অর্থাৎ প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানরা সবসময়ই একাট্টা থাকবেন বলে মনে হয় না। বিভিন্ন রাজ্যের গভর্নর পদেও ডেমোক্র্যাটরা বেশি সংখ্যায় জিতেছেন। সব মিলিয়ে রিপাবলিকানদের জন্য এ নির্বাচন একটি ধাক্কা নিঃসন্দেহে।

এটি ঠিক, ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিপজ্জনক কিছু নীতি বর্জন করলেও জো বাইডেন অনেক ক্ষেত্রে তাঁর পথেই হেঁটেছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তের আলোকেই আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার করা হয়। চলমান ইউক্রেন যুদ্ধ দেখছি আমরা। সেখানে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বের অর্থনীতিতে সংকট তৈরি হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও তার প্রভাব স্পষ্ট। যদিও সেখানকার নাগরিকদের মধ্যে এ নিয়ে খুব মাতামাতি নেই। তারপরও যুদ্ধের প্রভাব ভোটের ফলকে কিছুটা প্রভাবিত করে থাকতে পারে।

নিম্নকক্ষ তথা প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্রেটিক দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় জো বাইডেন আগের মতো স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। সাধারণত মার্কিন নাগরিকরা মধ্যবর্তী নির্বাচনে একটি বার্তা দিয়ে থাকে। সে জন্য জো বাইডেনকে সতর্ক পদক্ষেপ নিতেই হবে। তিনি যদি এ সময়ে জনগণকে সন্তুষ্ট করতে না পারেন, এর প্রভাব দুই বছর পরের জাতীয় নির্বাচনে অবশ্যই পড়বে। তবে তাঁর সিদ্ধান্তগুলো যদি রিপাবলিকানরা আটকে দেয় এবং তিনি পরিকল্পনামতো কাজ করতে না পারেন, তাতে ট্রাম্পের প্রভাব বাড়বে এবং তাঁর পথ প্রশস্ত হবে। ইউক্রেন যুদ্ধের কথা যদি বলি, সেখানে রিপাবলিকানরা হয়তো সমর্থন দেবে। কিন্তু প্রশ্ন উঠতে পারে- যুদ্ধে তারা কতটা সমর্থন দেবে। কিংবা সহায়তার মাত্রা কেমন হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন কেবল দেশটির জন্যই নয়, বরং আন্তর্জাতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। কংগ্রেসের উভয় কক্ষে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ার মানে হলো, তাদের নীতিগত দিক থেকে কিছুটা ছাড় দিতে হবে। এখানে রিপাবলিকানদের প্রভাব তৈরি হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্য দেশের সম্পর্ক চর্চার ওপর। এ ক্ষেত্রে জো বাইডেনকে সতর্কতার সঙ্গে পদক্ষেপ নিতে হবে। অর্থনৈতিক সংকট সামাল এবং মূল্যস্ম্ফীতি কমাতে না পারলে তার ফল ভালো হবে না। এ ক্ষেত্রে রিপাবলিকানরা এগিয়েই বলা চলে। তারা মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারণায়ও অর্থনীতির বিষয়টি জোরালোভাবে এনেছে। সময়ের সঙ্গে এবং ভোটারদের চাহিদার আলোকে জো বাইডেন সঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন- এটিই প্রত্যাশিত। না হলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফিরে আসা ঠেকানো কঠিন হতে পারে। তবে ট্রাম্পের প্রার্থিতা ঘোষণার মাধ্যমে মার্কিন সমাজের ভেতর দৃশ্যমান মেরূকরণ, বর্ণবাদ ও উগ্রবাদ আরও বাড়বে। ওবামা ও বাইডেনের গণতন্ত্রের সংকট এবং এর উদ্বেগ আরও স্থায়ী রূপ ধারণ করতে পারে।

ড. দেলোয়ার হোসেন: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; প্রেষণে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সদস্য হিসেবে নিয়োজিত।

সমকালে প্রকাশিত [লিংক]