What Is to be Done in Time of Great Crisis

226

গত কয়েক বছর ধরেই লক্ষ করা যাচ্ছে, বিশ্ব এক সংকট ও অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। এ সংকট আমরা সবচেয়ে বেশি অনুধাবন করতে পারি ২০১৯ সালের শেষের দিকে করোনা মহামারির (পরবর্তী সময়ে অতিমারিতে পরিণত হয়) মধ্য দিয়ে।

বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত বা ধনী রাষ্ট্র থেকে দরিদ্রতম রাষ্ট্রটি পর্যন্ত বাদ যায়নি এ করোনাভাইরাসের ‘ধ্বংসযজ্ঞ’ থেকে। আমরা জানি, বিশ্ব এখন পর্যন্ত প্রায় ৬৫ লাখ ৯৬ হাজার মানুষের মৃত্যুর সাক্ষী হয়েছে এ অতিমারির কারণে। সবচেয়ে উন্নত রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যু হয়েছে প্রায় ১১ লাখ মানুষের। বস্তুত এটি শুধু এক মানবিক বিপর্যয়ের সাক্ষ্যই বহন করছে না, বরং এক কঠিন বাস্তবতা, যা বর্তমান বিশ্বসভ্যতার নাজুক অবস্থার প্রমাণ দেয়। দুর্বলতাগুলো একেবারে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে এ অতিমারি।

আন্তর্জাতিক রাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বোঝা যাবে, এ অতিমারি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিকভাবে যে সম্মিলিত প্রয়াস নেওয়ার প্রয়োজন ছিল, তা নিতে ব্যর্থ হয়েছে বিশ্ব। যে ঐক্যবদ্ধভাবে এর সামনে দাঁড়ানো যেত, তার অভাব বেশ প্রকটভাবে প্রতীয়মান হয়েছে। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে যেসব পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন ছিল, তা নিতে রাষ্ট্রগুলো বেশ দুর্বলতার পরিচয় দিয়েছে। এ ধরনের বৈশ্বিক মহামারি মোকাবিলার জন্য যে বহুপাক্ষিক সহযোগিতা ও তৎপরতার দরকার, এ ক্ষেত্রে তাও অনুপস্থিত ছিল।

কোভিড-১৯-এর টিকা নিয়ে যে দৃষ্টিভঙ্গি দেখা গেছে, তাতে এ অতিমারি মোকাবিলায় অসহায়ত্বের শিকার হয়েছে গোটা বিশ্ব। প্রতিটি দেশ এককভাবে চেষ্টা করেছে এ অতিমারিকে মোকাবিলার। এ সবকিছু ইঙ্গিত দেয় এক ধরনের নিষ্ঠুরতার। বিশ্ব যে বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে, সেখানে যে ধরনের মানবিকতা ও আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংহতি ও সহযোগিতার প্রয়োজন ছিল, তা প্রদর্শিত হয়নি।

২০২০ সাল থেকে এই অতিমারিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল এক রাজনীতি। দৃষ্টিগোচর হয় এক নতুন মহামারিকেন্দ্রিক কূটনীতির। ভ্যাকসিন ন্যাশনালিজম বা টিকা জাতীয়তাবাদের উদ্ভবও লক্ষ করা যায়। দেশগুলোর আচরণে দেখা দেয় সুবিধা নেওয়ার প্রবণতা। আন্তর্জাতিকভাবে শক্তিশালী ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো মেতে ওঠে বিভিন্ন উপায়ে মুনাফা বৃদ্ধি নিয়ে।

তবে এতকিছুর মাঝেও বিশ্ব কোভিড-১৯-এর ধকল সামলে উঠছিল। ঠিক এ অবস্থায় বিশ্ব পতিত হলো এক নতুন বিভীষিকায়, যা ইউক্রেন যুদ্ধ নামে আলোচিত ও সমালোচিত হচ্ছে। যখন সমগ্র বিশ্ব করোনা মহামারির মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে তখন, ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি, রাশিয়া কর্তৃক ইউক্রেন আক্রমণের মধ্য দিয়ে এ নতুন সংকটের সূচনা হয়। অবশ্য এ যুদ্ধের প্রেক্ষাপট গত এক দশক ধরেই তৈরি হয়েছে।

এ সংকটের কারণ হিসাবে চিহ্নিত করা যায় পশ্চিমের নিরাপত্তা স্বার্থ এবং বিশ্বব্যাপী কর্তৃত্ব স্থাপনের পথে হুমকি হিসাবে রাশিয়াকে চিত্রায়িত করা। অপরদিকে রাশিয়ার কর্তৃত্ব স্থাপন বা তার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য পশ্চিমা বিশ্বকে হুমকি হিসাবে দেখাও এ যুদ্ধের একটি কারণ হিসাবে চিহ্নিত করা যায়।

এ কারণেই আমরা দেখতে পেলাম, ইউক্রেন রাশিয়ার প্রতিবেশী হয়েও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেছে। এ দুটি জোটকে রাশিয়া তার নিরাপত্তার জন্য চ্যালেঞ্জ হিসাবে দেখে। ইউরোপের অভ্যন্তরে এরকম বিভাজন-একদিকে রাশিয়া, আরেকদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত পশ্চিমা জোট-এক দশকের উত্তেজনাকে ভয়ংকর এক পরিণতির দিকে নিয়ে গেছে ইউক্রেন যুদ্ধের মাধ্যমে।

শুরুর দিকে এ আক্রমণকে অনেক বিশেষজ্ঞই সহজভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। তারা ধারণা করেছিলেন, এ যুদ্ধ হয়তো ক্ষণস্থায়ী হবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, এ যুদ্ধ বন্ধ না হয়ে বরং নতুন কিছু সংকটের জন্ম দিয়েছে। যেমন-রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমা জোট অর্থনৈতিক অবরোধ দিলে রাশিয়াও পালটা জবাব হিসাবে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে।

এই পালটাপালিটি অবরোধে একদিকে রাশিয়ার অর্থনীতির মূল চাবিকাঠি তেল আর গ্যাসের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; অন্যদিকে বিশ্ব দেখতে পেয়েছে খাদ্যভান্ডারের সংকট। ইউক্রেনের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ যুদ্ধ খুব দ্রুত একটি বৈশ্বিক সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে। প্রভাব লক্ষ করা যাচ্ছে বিভিন্ন দেশের অর্থনীতির ওপর। ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা ‘বৈশ্বিক দক্ষিণ’ বলতে মূলত উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশের সমষ্টিকে বোঝায়, যারা অর্থনৈতিকভাবে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এ যুদ্ধের কারণে।

এ মহাসংকট ও অনিশ্চয়তার কবলে পড়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিসহ অভ্যন্তরীণ সবকিছু। ফলে সময় এসেছে বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সঠিকভাবে বিবেচনায় নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের। সামষ্টিকভাবে যে পদক্ষেপ বা কার্যক্রম সরকার গ্রহণ করুক না কেন, ব্যক্তি পর্যায়ে উপলব্ধি ও দায়িত্ব পালনের বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আর তাই কিছু বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি দেওয়ার সময় এসেছে, যা হয়তো সহায়তা করবে এ কঠিন সময় উতরে যেতে।

প্রথমেই দৃষ্টিপাত করতে হবে এ পরিস্থিতির ব্যাপকতা নিয়ে। সমগ্র বিশ্বই পার করছে এক কঠিন সময়। কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের সংকট নয় এটি। ইউক্রেন যুদ্ধ ও চলমান কোভিড মহামারির কারণে সমগ্র বিশ্বই এক সংকটের মাঝে পতিত। এ সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন গভীর ভাবনার। ভাবতে হবে এ সংকট সম্পর্কে। স্বরূপ সন্ধানের মাধ্যমে অনুধাবন করতে হবে, এটি আসলেই কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা অঞ্চলকেন্দ্রিক, নাকি এর ব্যাপ্তি বিশ্বজুড়ে। ভেবে দেখতে হবে এ সংকটের উৎস কোথায়। অনুধাবন করতে হবে এর গভীরতা। দেখতে হবে আমাদের কোন কোন খাত রয়েছে সবচেয়ে বেশি নাজুক অবস্থায়।

বাংলাদেশের নাগরিক হিসাবে আমাদের দায়িত্ব এ বৈশ্বিক প্রবণতাগুলো সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখা। অভ্যন্তরীণ বাস্তবতার সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকলেও এককভাবে বিবেচনার সুযোগ নেই এ বিষয়গুলো। আমাদের বিভিন্ন মেগা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও খেয়াল রাখতে হবে আমাদের এখনো রয়েছে সম্পদের ঘাটতি, আয়ের সীমাবদ্ধতা। উন্নয়নের ফলে অবশ্যই এসেছে পরিবর্তন; কিন্তু তার বাস্তব প্রতিফলন দেখতে হলে অপেক্ষা করতে হবে কিছুটা সময়। এ সময়টুকুর জন্য অপেক্ষা করাটাই বাস্তবতা। আর এ বাস্তবতার সঙ্গে সংগতি রেখেই বিবেচনা করতে হবে বৈশ্বিক প্রবণতাগুলো।

দ্বিতীয় যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো-কৃচ্ছ্রসাধন ও মিতব্যয়ী হওয়া। নাগরিক হিসাবে আমরা প্রত্যেকেই নিজস্ব দৈনন্দিন পরিকল্পনায় ঘটাতে পারি এ দুটি বিষয়ের প্রতিফলন। একদিকে আর্থিক সংগতির ওপর চাপ কমানো উচিত, সেই সঙ্গে কমাতে হবে আমাদের ভোগের মাত্রা। এর ফলে প্রথমেই চাপ কমবে জ্বালানি ও খাদ্যের ওপর। এর সঙ্গে খেয়াল রাখতে হবে অপচয় রোধ করার বিষয়টির ওপর। জ্বালানি ও খাদ্যের ওপর চাপ কমালে এবং সেই সঙ্গে অপচয় রোধ করা গেলে সংকটকালে সবাই উপকৃত হবে।

রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে খাদ্যের চাপ কমলে উৎপাদনের ওপর চাপ কমবে। উৎপাদনের ওপর চাপ কমলে আমদানিনির্ভরতা কমবে। এতে জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আসবে ইতিবাচক পরিবর্তন। যোগাযোগব্যবস্থা হবে গতিশীল। কারণ, জ্বালানির ব্যবহারে সাশ্রয়ী হলে জ্বালানির দাম হবে নিুমুখী। অর্থনৈতিক সংকট যে কারণে তৈরি হয়, যেমন-দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি প্রভৃতি ক্ষেত্রে পড়বে ইতিবাচক প্রভাব। এ সবকিছুই আমাদের আচরণ দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। এসবের ফলে মানুষের ব্যক্তিজীবনে আসবে গুণগত পরিবর্তন।

তৃতীয়ত, কৃচ্ছ্রসাধন ও অপচয় রোধ করলেই শুধু হবে না, হতে হবে উৎপাদনশীল আচরণের অধিকারী; যাতে করে সমাজে তৈরি হয় নতুন সম্ভাবনা। আর এ সম্ভাবনা বস্তুগত ও অবস্তুগত দুই ক্ষেত্রেই হতে হবে। এক্ষেত্রে কৃষি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর একটি বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য, যেখানে তিনি বলেছেন, আবাদি জমির এক ইঞ্চিও যাতে খালি না থাকে আবাদ করা থেকে। অবস্তুগত মূল্য সংযোজন বলতে বোঝায় উদ্ভাবনী হওয়াকে। উদ্ভাবনের ফল সরাসরি এবং সঙ্গে সঙ্গে না পাওয়া গেলেও সুদূরপ্রসারী প্রভাব বয়ে আনে এটি। অর্থনীতিকে দেয় একটি শক্ত ভিত্তি। সৃজনশীলতা অন্যান্য ক্ষেত্রকেও উৎসাহিত করে।

চতুর্থ বিষয়টি হচ্ছে, সংকটের সুবিধাভোগী শ্রেণির বিরুদ্ধে অবস্থান। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, এ ধরনের ক্রান্তিলগ্নে সমাজে সব সময়ই তৈরি হয় একটি সুবিধাভোগী শ্রেণির। এদের উপস্থিতি থাকে ব্যবসা, রাজনৈতিক, সামাজিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে। বাণিজ্যিক সুবিধা নেওয়া হয়ে থাকে এদের মুখ্য উদ্দেশ্য। এর ফলে সংকট বৃদ্ধি পায়। তাই জনগণকে সতর্ক থাকতে হবে এ সুবিধাভোগী শ্রেণি সম্পর্কে। একই সঙ্গে এই শ্রেণির অংশ হওয়া থেকেও নিজেকে সংবরণ করতে হবে। এ পরিবর্তন জনগণের মাঝেই প্রয়োজন। কারণ, সরকার হাজার চেষ্টা করলেও সম্ভব হবে না সংকট উত্তরণের, যদি না এই শ্রেণির উদ্ভব ঠেকানো যায়।

পঞ্চম ও শেষ যে নিয়ামকটির ওপর দৃষ্টি দিতে হবে গুরুত্বের সঙ্গে, তা হলো হতাশ না হওয়া। আমাদের ধৈর্য ধরে স্বাভাবিক আচরণ প্রদর্শন করতে হবে, নয়তো অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থার সাধারণ-স্বাভাবিক গতিশীলতা নষ্ট হবে। নৈরাশ্য তাই বর্জনীয়। নিরাশ ব্যক্তি পুরো সমাজের জন্য বোঝা। যে কোনো ক্রান্তিলগ্নে নৈরাশ্য সংকটকে আরও ঘনীভূত করে। আতঙ্কপ্রবণ মানুষ সংকটকে আরও তীব্র করে। কোনো সংকটই চিরস্থায়ী নয়। বাঙালি তার হাজার বছরের ইতিহাসে পার করেছে বহু সংকট। মোকাবিলা করেছে হাজারও দুর্যোগ। মনে রাখতে হবে, যে কোনো সংকটে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাই আমাদের বড় সম্পদ।

– ড. দেলোয়ার হোসেন: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; প্রেষণে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সদস্য হিসেবে নিয়োজিত।

যুগান্তরে প্রকাশিত [লিংক]