What Does the Result of Midterm Elections in the US Indicate?

186

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুসারে প্রেসিডেন্টের মেয়াদের দুই বছরের মাথায় একটি মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নিয়মানুসারে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের ক্ষমতা গ্রহণের দুই বছর পর ৮ নভেম্বর থেকে মধ্যবর্তী নির্বাচনের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ ফলাফল এখনো প্রকাশিত হয়নি। তবে নির্বাচন-পূর্ববর্তী বিভিন্ন জরিপের ফলাফলে বলা হচ্ছিল, রিপাবলিকানরা এগিয়ে থাকবে।

রিপাবলিকান দলের নেতা ও সমর্থকরা আইনসভায় তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে আসছিলেন। কিন্তু তারা যতটা প্রত্যাশা করেছিলেন, ঠিক ততটা সমর্থন তারা পাননি। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত ফলাফলে সেটাই ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এটি লক্ষণীয়, বাইডেন প্রশাসনের প্রতি জনগণের সমর্থনের অবনতি হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, চলমান ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে বাইডেনের নীতি, দেশটিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক সংকটের কারণে তিনি জনগণের সমর্থন হারিয়েছেন।

এখানে বলে রাখা জরুরি, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনব্যবস্থা একটি জটিল কর্মযজ্ঞ এবং একই সঙ্গে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণও বটে। এছাড়াও মার্কিন নির্বাচনি ইতিহাস বিবেচনা করলে আমরা লক্ষ করি, দেশটির আইনসভা দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে রাষ্ট্রের অঙ্গসংস্থাগুলোর মধ্যে ক্ষমতার একটি ভারসাম্য সব সময় বজায় থাকে।

সেদিক থেকে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের শাসন বিভাগ, আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগ-এই তিনটি অঙ্গ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের একধরনের আধিপত্য বিস্তার করার সুযোগ পেয়ে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় দেশটির রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং একই সঙ্গে কংগ্রেসের নির্বাচন ব্যাপক গুরুত্ব বহন করে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনৈতিক নীতি এবং বহির্বিশ্বে তার ক্ষমতার নীতি গ্রহণের ক্ষেত্রে আইনসভা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এছাড়াও বৈশ্বিক রাজনীতি ও কূটনীতির বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ও ক্ষমতার কারণে দেশটির মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ঘিরে গোটা বিশ্বের মানুষ ও বিশ্লেষকদের একটি আলাদা আগ্রহ থাকে।

এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। এর মধ্যে আমরা লক্ষ করছি, যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে এবং এ যুদ্ধের যে অন্যতম পক্ষ তথা পশ্চিমা বিশ্ব, এর নেতা হিসাবে যুক্তরাষ্ট্র আবির্ভূত হয়েছে। সেই অর্থে ইউক্রেন যুদ্ধের অন্যতম দুই পক্ষ হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া। অপরদিকে এ যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার ওপর যে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে এবং বিশ্ব অর্থনীতির যে সংকট তৈরি হয়েছে, তার সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে যুক্তরাষ্ট্র একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসাবে কাজ করছে। অন্যদিকে, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাব হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও আমরা লক্ষ করছি, তাদের বিভিন্ন অর্থনীতির সূচকে দেশটি পিছিয়ে পড়ছে এবং বড় ধরনের অবনমন ঘটেছে। বিশেষ করে দেশটি বিগত ৪০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বাজেভাবে মূল্যস্ফীতির সম্মুখীন হচ্ছে।

ফলে জনগণের মধ্যে অর্থনীতি নিয়ে একধরনের অসন্তোষ বিরাজ করছে। অধিকন্তু, এসব বাস্তবতার কারণে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের মধ্যকার যে রাজনৈতিক সম্পর্ক, তা অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় এসে পৌঁছেছে। বস্তুত ২০২১ সাল থেকেই তাদের মধ্যকার সম্পর্ক খুব দ্রুত খারাপ হতে শুরু করে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটাল হিলের ঘটনা কংগ্রেসের মধ্যে দুটি দলের সম্পর্ক আরও জটিল করে তোলে। এ পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নির্বাচন ছিল এই মধ্যবর্তী নির্বাচন।

এবারের নির্বাচন বিভিন্নভাবে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনের ফলাফল কী হবে, রিপাবলিকানরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে বাইডেন কতটা চাপে পড়বেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রে এটি কী প্রভাব ফেলবে-এসব প্রশ্ন এখন সামনে চলে আসছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বেশকিছু বিষয় সামনে চলে আসছে। এই নির্বাচনকে একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের আইন পরিষদের আধিপত্য বিস্তারের লড়াই হিসাবে, অন্যদিকে ২০২৪ সালে অনুষ্ঠেয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কোন দল সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে, তার একটি ইঙ্গিত হিসাবে আমরা দেখতে পাচ্ছি। কারণ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বহুলপ্রচলিত ধারণা হচ্ছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে মূলত পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের একটি রূপরেখা। এখন পর্যন্ত নির্বাচনের ফলাফলে আমরা একটিই বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি, তা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের নিম্নপরিষদে যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ডেমোক্র্যাটদের ছিল, সেটি এখন বড় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন।

দ্বিতীয়ত, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে যে বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে তার অন্যতম হচ্ছে জো বাইডেনের শাসন ও জনপ্রিয়তা। বাইডেন প্রশাসন কতটা জনপ্রিয়তা বজায় রাখতে পারবে, সেটি একটি ইস্যু হয়ে উঠেছে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের এই নির্বাচনের প্রাক্কালে জো বাইডেনের জনপ্রিয়তা ৪০ শতাংশে নেমে এসেছে, অন্যদিকে ৫৫ শতাংশ মানুষ মনে করছে, জো বাইডেনের শাসন সঠিক নয়। অর্থাৎ তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার একধরনের অবনতির মধ্য দিয়েই নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ফলে তা বাইডেনের ওপর একটি চাপ তৈরি করেছে এবং এটি একটি গণভোট হিসাবে চিহ্নিত হচ্ছে, যা দেশটির ইতিহাসে খুব একটা দেখা যায়নি।

তৃতীয়ত, এ মধ্যবর্তী নির্বাচন কেন্দ্র করে আরও একটি বিষয় বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। সেটি হচ্ছে, আমরা যদি ক্যাম্পেইন বা প্রচারাভিযান লক্ষ করি, সেখানে দেখতে পাই-এই প্রচারণায়, বিশেষ করে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষের প্রচারণায় সাবেক প্রেসিডেন্ট বারক ওবামা খুব সক্রিয়ভাবে অংগ্রহণ করেছেন। ওবামা এবং বাইডেন উভয়েই কিন্তু জোর দিয়ে বলেছেন, এই মধ্যবর্তী নির্বাচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে গণতন্ত্র রক্ষা করা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র যে সংকটের মধ্যে আছে, তা রক্ষা করতে হলে এই নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বিজয়ী করতে হবে।

চতুর্থ বিষয়টি হচ্ছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এবারের নির্বাচনে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে ইউক্রেন যুদ্ধ এর মধ্যে সরাসরি চলে না এলেও একটি বড় কারণ হিসাবে পাশাপাশি রয়েছে, কারণ এ যুদ্ধের সঙ্গে অর্থনীতির সংকটের একটি সম্পর্ক রয়েছে। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন রাজ্যে দেখা গেছে, সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটাররা সবচেয়ে উঁচুতে রেখেছে অর্থনীতির বিষয়টি। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে দেশটির আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতির বিষয়টি অনেকেই আমলে নিয়েছে এবং সেখান থেকে বের হওয়ার জন্য অনেকেই বাইডেনের দলের বিরুদ্ধে ভোট দিয়ে থাকতে পারেন।

ইতোমধ্যে ফলাফলে আমরা দেখতে পাচ্ছি, নিম্নকক্ষের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানদের হাতে চলে যাচ্ছে এবং বলা যায়, যতটা সহজে বাইডেন বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন, বিশেষ করে যুদ্ধ ও অর্থনীতিকে রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এবং বিভিন্ন মিত্ররাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলো পরবর্তী সময়ে একইভাবে পরিচালনা করা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে ভবিষ্যতের নির্বাচনে অর্থাৎ ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ব্যাপারে একটি বড় ধরনের প্রশ্নবোধক চিহ্ন তৈরি হয়েছে। সেটি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, যখন বাইডেন পুনরায় নির্বাচন করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। সেদিক থেকে বর্তমানে তার জনপ্রিয়তা হ্রাসের বিষয়টি থেকে পরবর্তীকালে নির্বাচন করার কতটুকু সম্ভাবনা রয়েছে, সে বিষয়টিও সামনে চলে আসছে।

বাইডেনের জনপ্রিয়তা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। ফলে তার পক্ষে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা অত্যন্ত কঠিন হবে। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদের গণতন্ত্রের সংকটের বিষয়টি একটি বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এবং বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বারবার গণতন্ত্রের সংকটের কথা মার্কিন জনগণকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। অন্যদিকে বর্ণবাদ, উগ্রবাদ, বৈষম্য, সন্ত্রাসবাদ, গর্ভপাতের স্বাধীনতার মতো বিষয়ও সমান গুরুত্ব পাচ্ছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের নাজুক অর্থনীতি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও বৈদেশিক বিভিন্ন নীতিও অনেকটা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। সর্বোপরি, এ নির্বাচনের ফলাফল সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ২০২৪-এর নির্বাচনি প্রস্তুতির সুযোগ করে দেবে। নিম্নকক্ষে রিপাবলিকানদের শক্তিশালী অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। এমতাবস্থায় বলা যায়, সামনের দিনগুলোয় জো বাইডেন নিঃসন্দেহে চাপমুক্ত থাকবেন না এবং চাপের মধ্যেই তাকে পরবর্তী দুই বছর রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হবে।

– ড. দেলোয়ার হোসেন: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; প্রেষণে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সদস্য হিসেবে নিয়োজিত।

যুগান্তরে প্রকাশিত [লিংক]