The Success of Bangladesh in the UN Human Rights Diplomacy

395

জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই মানবাধিকার কূটনীতির সঙ্গে বিশ্ব সংস্থাটি যুক্ত। মানবাধিকারসংক্রান্ত বিভিন্ন চুক্তি, ঘোষণা, কনভেনশন, জাতিসংঘের ভেতর সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে দর-কষাকষি ও আলোচনার মাধ্যমে অনুমোদিত হয়েছে। ফলে মানবাধিকার কূটনীতির সঙ্গে জাতিসংঘের সম্পর্ক অনেক পুরোনো। তবে ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক কাউন্সিলের মাধ্যমে মানবাধিকার কূটনীতিতে এই সংস্থাটি ব্যাপকভাবে ভূমিকা রেখে আসছে। মানবাধিকার রক্ষার ব্যাপারে যে কাঠামোগত প্রয়াসের সূচনা জাতিসংঘের হাত ধরে হয়, তারই বহিঃপ্রকাশ জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক কাউন্সিল (United Nations Human Rights Council).

এই কাউন্সিলের যাত্রার শুরু থেকেই বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বেশ প্রশংসার সঙ্গে আলোচিত হয়ে আসছে। একেবারে শুরু থেকেই বাংলাদেশ এই কাউন্সিলের সদস্যপদে নির্বাচিত হওয়ার সম্মান অর্জন করে। মানবাধিকারবিষয়ক বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা ও মানবাধিকারকেন্দ্রিক বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শুরু থেকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে এই অঙ্গ সংস্থাটি। বৈশ্বিক পর্যায়ে মানবাধিকার-সম্পর্কিত বিষয়াদি তুলে ধরা ও বিভিন্ন রাষ্ট্রের মাঝে সহযোগিতা রক্ষা করাই হচ্ছে এই কাউন্সিলের মূল কর্মকাণ্ড।

১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা গৃহীত হয়। সূচনালগ্ন থেকেই এ ঘোষণা বিভিন্ন বিতর্ক ও বিরোধিতার মধ্য দিয়ে যায়। এ ছাড়া মানবাধিকার নিয়ে কাজ করার জন্য জাতিসংঘের বিশেষ কোনো সংস্থা তখন পর্যন্ত কার্যক্রম শুরু করেনি। ছিল উচ্চতর প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখার অভাব। স্নায়ুযুদ্ধের সময় বিশ্ব মূলত নিরাপত্তা ও শান্তির বিষয়গুলোকে বেশি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করত। অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও নিরস্ত্রীকরণ বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলের মাঝে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য এক বিশেষ চ্যালেঞ্জ ছিল। এই চ্যালেঞ্জের মূলে ছিল দুই পরাশক্তির মাঝের দ্বন্দ্ব, যা স্নায়ুযুদ্ধ হিসেবে প্রসিদ্ধ। একদিকে পশ্চিমা বিশ্ব তাদের পুঁজিবাদীব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে আধিপত্য বিস্তার করে। অন্য দিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন সমাজতন্ত্রকে সামনে রেখে তাদের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করেছে। তাই জাতিসংঘের মানবাধিকার কূটনীতির জায়গাটি সেই অর্থে শক্তিশালী ছিল না। কেননা, পরাশক্তিগুলোর অগ্রাধিকারের মাঝে এই মানবাধিকার রক্ষার মতো বিষয়গুলো স্থান পায়নি। তার পরও যতটুকু স্থান পেয়েছে তা ব্যবহৃত হয়েছে কূটনৈতিক অস্ত্র হিসেবে। পশ্চিমের দেশগুলোকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রাষ্ট্রের ওপর মানবাধিকার রক্ষার ব্যাপারে চাপ প্রয়োগ করলেও স্বার্থের খাতিরে অনেক অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী সরকারের সঙ্গেও সম্পর্ক স্থাপন করতে দেখা গেছে।

তবে ২০০৬ সালে এই কাউন্সিল প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। এই প্ল্যাটফর্ম আন্তরাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সহযোগিতার মাধ্যমে মানবাধিকারের মূল বিষয়গুলো প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। কার্যপ্রণালি কার্যকররূপে পরিচালনার জন্য ৪৭ দেশের এক শক্তিশালী নির্বাচিত কাউন্সিল কাজ করে আসছে। এসব দেশ পৃথিবীর পাঁচটি ভিন্ন অঞ্চল থেকে নির্বাচিত হয়ে তারপর এই কাউন্সিলের সদস্য হয়। আফ্রিকা থেকে ১৩টি, এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে ১৩টি, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চল থেকে ৮টি, পশ্চিম ইউরোপ থেকে ৭টি এবং পূর্ব ইউরোপ থেকে ৬টি করে দেশ নির্বাচিত হয়। এই কাউন্সিল ৩ বছরের জন্য নির্বাচিত হয়। পরপর দুই মেয়াদে কোনো দেশ দায়িত্ব পালন করলে তৃতীয় মেয়াদের জন্য তা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারে না। এসব কিছুর ধারাবাহিকতা রক্ষায় এ বছরও অনুষ্ঠিত হয়েছে নির্বাচন আর তাতে বাংলাদেশ নির্বাচিত হয়েছে বিপুল ভোট প্রাপ্তির মাধ্যমে। বাংলাদেশ এশিয়া প্রশান্ত অঞ্চলের সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া দেশ। বাংলাদেশের প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা ১৬০। জাতিসংঘের সদস্য সংখ্যা আমলে নিলে এই ভোট বেশ বড় প্রাপ্তির ইঙ্গিত দেয়, যেখানে ৩টি রাষ্ট্র ভোট দানে বিরত ছিল। বাংলাদেশ ছাড়াও রয়েছে ১৪৫ ভোট নিয়ে ভিয়েতনাম, ১৫৪ ভোট নিয়ে মালদ্বীপ আর ১২৬ ভোট নিয়ে কিরগিজস্তান। তবে ভেবে দেখার মতো বিষয় হচ্ছে, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র ১২৩ ভোট পেয়েছে। আফগানিস্তান ১২টি, বাহরাইন ও মঙ্গোলিয়া একটি করে ভোট পেয়েছে। নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা ও অনুপাতের ভিত্তিতে বলা যায় যে, এই জয় এক বিশেষ অর্জন। উল্লেখ্য, অতীতেও বাংলাদেশ বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছিল। এই জয়ে বাংলাদেশকে সাহায্য করবে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে আর বিভিন্ন রাষ্ট্রের সুচিন্তিত ভোটের মাধ্যমে অর্জিত এই জয় বাংলাদেশের সেই পথকে আরও মসৃণ করবে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সদস্যদের মাধ্যমে এই ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার দরুন বিশেষ ইস্যুতে বাংলাদেশের বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্যতাও সবার সামনে চলে এসেছে।

এ জয়ের পেছনে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার পরিস্থিতি ও বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার নিয়ে কাজ করায় বাংলাদেশের সক্রিয় অবস্থান বেশ কার্যকরী ভূমিকা রেখেছে। দেশের অভ্যন্তরে মানবাধিকার বিষয়টিকে বাংলাদেশ গুরুত্ব দিয়ে আসছে। বাংলাদেশ সব সময়ই মানবাধিকারকে অগ্রাধিকার দিয়ে এর বিভিন্ন দিক জনগণের সামনে তুলে ধরে আসছে। পাশাপাশি দেশের বাইরেও যৌথ বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রয়াসে বাংলাদেশের অবস্থান সবার প্রশংসা কুড়িয়ে আসছে বেশ আগে থেকেই। এই জয়ে শুধু এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলেই নয়, সমগ্র বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাংলাদেশের ওপর যে বিভিন্ন দেশ আস্থা রেখেছে মানবাধিকারের মতো নাজুক বিষয়ে, তার প্রমাণ বহন করে। এ ছাড়া এই জয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার জাতীয় ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের মানবাধিকারের প্রতি যত্নশীলতার স্বীকৃতি পেয়েছে বিশ্ব মঞ্চে। এই মেয়াদে বাংলাদেশ টানা দ্বিতীয়বারের মতো জয়লাভ করায় ৬ বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে এ কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে থাকার সুযোগ পেল।

মানবাধিকার বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে সার্বজনীন মনে হলেও এ ইস্যুতে বিতর্কের শেষ নেই। তাই মানবাধিকার কূটনীতি বিশ্ব রাজনীতিতে এখন এক মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। মানবাধিকারের সংজ্ঞা, এর বিভিন্ন দিক নিয়ে এখনো নানা মত প্রচলিত রয়েছে বিভিন্ন দেশ, সংস্কৃতি ও ব্যক্তির মাঝে। তাই এ বিষয়টিকে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে বিভিন্ন দেশের নিজস্ব বাস্তবতা, ইতিহাস ও সমাজব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। এই বিভিন্নতার কারণেই জাতিসংঘের সদস্য সংখ্যা ১৯৩টি। যদি পারস্পরিক ভিন্নতা নাই থাকত তবে পৃথিবীর মানুষ একটি মাত্র রাষ্ট্রের নাগরিক হতো। আর এই কারণেই যেকোনো ইস্যুতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মাঝে ব্যাপক মতপার্থক্য দেখা যায়। এখানে জাতিসংঘের কাজ হচ্ছে নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ইস্যুতে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয় করা। এদের মাঝে সহযোগিতা ও আলোচনার প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা। আর একেই জাতিসংঘভিত্তিক কূটনীতি বলা হয়ে থাকে।

এই কূটনীতির বিষয় হিসেবে আমরা পাই, জলবায়ু পরিবর্তন, মানবাধিকার বা বিভিন্ন অর্থনৈতিক সমস্যা বা বাণিজ্যবিষয়ক আলোচনা। এর বাইরেও বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা যেমন মানব পাচার ইত্যাদি নিয়েও বিস্তর আলোচনা হয় জাতিসংঘে। এরই অংশ হিসেবে মানবাধিকারের বিষয়গুলো নিয়ে বিভিন্ন দেশের ভাবনা, দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয় করতে তাদের মাঝে আলোচনার মাধ্যম তৈরি এবং তাদের কর্মক্ষেত্র ও এর পরিধি বৃদ্ধির জন্য করণীয় সম্পর্কিত বিভিন্ন ইস্যুর সঙ্গে মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতিতে জাতিসংঘের করণীয় বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা হয় এখানে। তাই জাতিসংঘের মানবাধিকার কূটনীতি বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। এখানে বাংলাদেশের ভূমিকা অত্যন্ত স্পষ্ট ও গ্রহণযোগ্য। এই গ্রহণযোগ্যতার পরিচায়ক বাংলাদেশের প্রাপ্ত ১৬০ ভোট। এটি ওই রাষ্ট্রগুলোর বাংলাদেশের প্রতি এক ইতিবাচক মনোভাবের প্রকাশ।

তবে পশ্চিমা শক্তিগুলো প্রায়ই এই মানবাধিকারের ইস্যুগুলোকে তাদের স্বার্থের খাতিরে ব্যবহার করে থাকে। দেখা যায় যে, তারা বিভিন্ন দেশকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য অভিযুক্ত করে এমনকি বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে তারা হস্তক্ষেপও করে থাকে। এই মনোভাব জাতিসংঘের মানবাধিকার কূটনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কেননা, জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল করা হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে মানবাধিকারের বিষয়গুলোতে সহযোগিতা করা, ব্যবস্থা নেয়া বা কোনো চুক্তি সম্পাদন বা পদক্ষেপ এবং সুপারিশ গ্রহণ করার ব্যাপারে এখতিয়ারভুক্ত করে তা বাস্তবায়ন করার ব্যাপারে সহায়তা করা। বিভিন্ন রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণের সময় এ বিষয়টিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে। এই আচরণ একদিকে মানবাধিকার বিষয়ে জাতিসংঘের ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, সেই সঙ্গে নিজেদের অবস্থানকেও বিশ্বের সামনে প্রশ্নবিদ্ধ করে। জাতিসংঘের বাইরেও মানবাধিকার নিয়ে এ ধরনের কূটনৈতিক তৎপরতা উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোকে উদ্বেগের ভেতর ঠেলে দেয়। মানবাধিকার লঙ্ঘনের সীমা নির্ধারণ বেশ কঠিন। কেননা, এর ব্যাপকতার কথা আমলে নিলে দেখা যাবে বিশ্বের প্রায় সব স্থানেই কোনো না কোনো সময়ে, কোনো না কোনো পদ্ধতিতে মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে এবং হচ্ছে। তাই বিশেষ কিছু রাষ্ট্রের মানবাধিকার নিয়ে বক্তব্য রাখা মানবাধিকার কাউন্সিলের মূল কাজের সম্পূর্ণ বিপরীত। বরং জাতিসংঘের মানবাধিকারভিত্তিক সংস্থাটিকে আরও কার্যকরী করা, শক্তিশালী করা এবং সেই সংস্থার মানবাধিকার পরিস্থিতি সঠিকভাবে অনুধাবন করার ক্ষেত্রে সক্ষমতা অর্জনের ব্যাপারে বিশ্বশক্তিগুলোর আরও সচেষ্ট হওয়া উচিত। ৪৭ সদস্যবিশিষ্ট সংস্থাটি মানবাধিকার নিয়ে প্রশংসনীয় সব পদক্ষেপ নিয়ে যাচ্ছে। তবে আরেকটি বিষয় উল্লেখ্য, জাতিসংঘের ১২৩টি দেশ কোনো না কোনোভবে এই কাউন্সিলের সদস্যপদ পেয়েছে। বাকি দেশগুলোর এখনো সদস্যপদ লাভের সুযোগ হয়নি। এখান থেকেই বাংলাদেশের মানবাধিকার কূটনীতির গুরুত্ব ও সক্ষমতা আরেকবার অনুধাবন করা যায়। মানবাধিকারকে আরও শক্তিশালী করার ব্যাপারে সবার সচেষ্ট হওয়া উচিত। জাতিসংঘের যে ভূমিকা সেখানে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি বেশ শক্তিশালী হবে। এ ছাড়া বিপুল ভোটে জয় পাওয়া বাংলাদেশকে অনুপ্রাণিত করবে নতুন উদ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষ করে এই কাউন্সিলে মানবাধিকার রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে।

– ড. দেলোয়ার হোসেন: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; প্রেষণে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সদস্য হিসেবে নিয়োজিত।

প্রকাশিত দৈনিক বাংলা [লিংক]